• ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১১ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই লেবাননে হামলা চালান নেতানিয়াহু, শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব ইরানের

Usbnews.
প্রকাশিত এপ্রিল ২৭, ২০২৬
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই লেবাননে হামলা চালান নেতানিয়াহু, শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব ইরানের
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দিয়েছেন, তা মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র বলে দাবি করেছেন দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা।

ইসরায়েলি সংবাদপত্র ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা আদতে একটি ‘শক্তি প্রদর্শন’ বা লোকদেখানো হুঁশিয়ারি, যার উদ্দেশ্য ছিল জনরোষ প্রশমিত করা এবং যুদ্ধের দায়ভার সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর ওই নাটকীয় বিবৃতির পর রণক্ষেত্রে সামরিক নির্দেশনায় কার্যত কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে পাওয়া আগের নির্দেশনার বাইরে নতুন কোনো অপারেশনাল প্ল্যান বা কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়নি।

মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির রূপরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বর্তমানে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে এটিই স্পষ্ট হচ্ছে, জনসমক্ষে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার কঠোর বার্তা দিলেও পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহু প্রশাসন পূর্বের সমঝোতাগুলো মেনেই এগোচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা ও লেবানন যুদ্ধে আশানুরূপ সাফল্য না আসা এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বাঁচতেই নেতানিয়াহু এ ধরনের কড়া বক্তব্য দিচ্ছেন।

২৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সামনে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মুখোশ পরে বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিও ইঙ্গিত দেয় যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ বাড়ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চাপের মুখে নিজেকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে জাহির করতে এবং যেকোনো সামরিক ব্যর্থতার দায় থেকে মুক্তি পেতে তিনি সেনাবাহিনীকে সামনে ঠেলে দিচ্ছেন।

সামগ্রিকভাবে ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর এই প্রতিবেদনটি নেতানিয়াহু সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর কথা বলছেন, সেখানে সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী কার্যক্রমগুলো কেবল পূর্বের রুটিন মাফিক পরিচালিত হচ্ছে।

এই দ্বিমুখী অবস্থানের ফলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রকৃত ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধের ময়দানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না আসায় প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক কৌশল শেষ পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তা কতটা রক্ষা করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস অ্যাক্সিওসের বরাত দিয়ে গাল্ফ নিউজ জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শেষ করা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরানের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং পরবর্তীতে ইরান এবং লেবাননে আর আগ্রাসী হামলা হবে না— এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে।

দ্বিতীয় পর্যায় : যদি প্রথম স্তরের দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মেনে নেয়, তাহলে দ্বিতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি পরিচালনা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আলোচনা চলবে।

তৃতীয় পর্যায় : যদি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সঙ্গে এই যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মীমাংসায় পৌঁছায়, তখন ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

ইরানের নতুন প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস অ্যাক্সিওস বলেছেন, ‘এসব খুবই সংবেদনশীর কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে না। আমাদের প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও কার্ড আছে এবং আমরা কেবল এমন একটি চুক্তিতেই রাজি হবো— যা মার্কিন জনগণকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ইরানকে কখনও পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না।

ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও সেই বৈঠক ব্যর্থ হয় এবং প্রতিনিধিরা কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করেই ফিরে যান।

প্রথম দফা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দ্বিতীয় দফা সংলাপে আসার আমন্ত্রণ জানায় পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। ১১ এপ্রিলের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি গত কয়েক দিনে একাধিকবার পাকিস্তান সফরে গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয়বার সরাসরি সংলাপে বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইরানের এই প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনিও তার প্রতিনিধি দলকে ফের ‘১৮ ঘণ্টার ফ্লাইটে’ পাঠাতে আগ্রহী নন এবং এখন থেকে ফোনকলে যাবতীয় আলাপ-আলোচনা হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরেই নতুন প্রস্তাবটি দিয়েছে ইরান। গতকাল রোববার এক সংক্ষিপ্ত সফরে পাকিস্তান এসেছিলেন আরাগচি, তার আগে তিনি গিয়েছিলেন হরমুজ প্রণালীর অপর তীরের দেশ ওমানে। পাকিস্তানে সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে রাশিয়া গিয়েছেন আরাগচি।