জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ,সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান বিএনপি দলীয় এমপি ফজলুর রহমানের দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদ কক্ষ বেশ কিছু সময়ের জন্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলের সদস্যদের কঠোর সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ তুলে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দফায় দফায় হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কড়া নির্দেশনা দেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্যের সময় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগে ক্ষোভ
বক্তব্যের শুরুতেই ফজলুর রহমান তার প্রতি করা ব্যক্তিগত মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, তাকে আমি অসম্মান করি না, সবসময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলি। কিন্তু তার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য! তারা নাকি ইসলাম— এবং উনি যে বলছেন, ওইদিন বললো যে আমার দাড়ি পাকা, আমার চোখের সব পাকা। উনি আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর। আমি ৪৮ সনে জন্মগ্রহণ করেছি, উনি ৫৮ সনে জন্মগ্রহণ করেছেন।”
এ পর্যায়ে স্পিকার তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনাকে কি কেউ এই ধরনের উক্তিতে সম্বোধন করেছেন? এরকম তো সংসদে কেউ বলে নাই।” জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, “না করেছে।” স্পিকার পুনরায় বলেন, “আপনি কেন নিজের গায়ে টেনে নিচ্ছেন?” ফজলুর রহমান তখন জোর দিয়ে বলেন, “করেছে।”
মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াত প্রসঙ্গ
স্পিকার তাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে তিনি জামায়াতে ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কঠোর মন্তব্য করেন। ফজলুর রহমান বলেন, “আচ্ছা, আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন— উনি মুক্তিযুদ্ধ পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।”
তার এই মন্তব্যের পরপরই সংসদে ব্যাপক হট্টগোল ও শোরগোল শুরু হয়। স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দকে বলতে দেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।”
ফজলুর রহমান আবারও বলেন, “আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।”
সংসদ সদস্যদের হট্টগোল থামছে না দেখে স্পিকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড। মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান বসেন, বসেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, আশা করছি, বসুন। সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।”
ফজলুর রহমান বলেন, “আমি কিন্তু উনাদেরকে খারাপ কিছু বলি নাই।” স্পিকার আবারও বলেন, “বসেন মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ প্লিজ সিট ডাউন, প্লিজ সিট ডাউন। আমি বলছি প্লিজ সিট ডাউন। প্রতিবাদী সদস্যদের আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে ফজলুর রহমান বলেন, এই যে দেখেন তারা, তারা কী ধরনের আচরণ করছেন আজকে!”
স্পিকার সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, একটু মনোযোগ দিয়ে আমার কথাটি শোনার চেষ্টা করুন। মাননীয় সদস্য গাজী ইসলাম বসুন। মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান একটু ওয়েট করেন। একটু অপেক্ষা করুন।” তখন ফজলুর রহমান পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের নেতা জিয়াউর রহমানকে পেলে এরা হত্যা করতো ষোলই ডিসেম্বর আগে।”
স্পিকার তখন সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান, অপেক্ষা করুন। এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। দয়া করে বসুন। মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আমি বলি তারপর আপনি বলেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে, লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। আমি প্রতিদিনই বলি যে, ‘রুলস অফ প্রসিডিউর’ বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না।”
স্পিকার বলেন, “প্রত্যেকেরই বাকস্বাধীনতা আছে। যদি সরকারি দলের কোনও সদস্যের বক্তব্যে আপনাদের আপত্তি থাকে, আপনারা এরপরে তার বিরুদ্ধে যুক্তি খণ্ডন করুন। কিন্তু শিশুরাও লজ্জা পাবে এই ধরনের আচরণে। ফজলুর রহমান সাহেব যা বলেছেন, এরপরেই আপনাদের একজনকে টাইম দেবো। জনাব সদস্য ফজলুর রহমান, আপনি তিন মিনিটে আপনার বক্তব্য শেষ করেন।”
সংসদে ক্ষুব্ধ জামায়াত আমির, ‘পরিচয় ও আদর্শ’ এক্সপাঞ্জের দাবি
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নিজের পারিবারিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের করা মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াত ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। নিজের রাজনৈতিক অধিকার এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে সংশ্লিষ্ট অংশটি এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিন মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সংসদে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে এ দাবি জানান ড. শফিকুর রহমান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, মাননীয় সংসদ সদস্য বয়সে আমার বড়, তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সবকিছুই বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি।”
শফিকুর রহমান বলেন, “তিনি পার্সোনালি আমাকে অ্যাটাক করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি বলে থাকি, আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। উনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর উনি বলেছেন, কোনও মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত ইসলামী করতে পারে না। তাহলে কি উনাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে। এটি আমার নাগরিক অধিকার। আমি কোন দল করবো, কোন আদর্শ অনুসরণ করবো? এর ওপর হস্তক্ষেপ করার ন্যুনতম কোনও অধিকার রাষ্ট্র কিংবা সংবিধান কাউকে দেয়নি। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ করেছেন। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অনুরোধ করবো মাননীয় স্পিকার, তার এই অসংসদীয় অংশটা এখান থেকে যেন এক্সপাঞ্জ করা হয়। শেষে গিয়ে উনি, সংসদকে ফাংশনিং করার জন্য বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট যেটাই বলি, সেইটার ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসেছিলাম, কথা বলেছি, নোটিশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং পরের দিন এসে প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছি। তিনি এটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন কী দিয়েছেন? যার মগজ যেরকম তার কনক্লুশনও হবে তার মতো। একজন প্রবীণ ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আমি এই ধরনের আচরণ আশা করিনি।”
জামায়াতের আমির বলেন, “আমরা প্রথম দিনই বলেছি, ভালো কিছু শিখতে এসেছি। কাউকে হিট করা, গালি দেওয়ার মাধ্যমে বড় কিছু অর্জন করা যাবে না। কিছু গলাবাজি হতে পারে বড় জোর, কিন্তু তার চাইতে বেশি কিছু হবে না। আর সাধারণত যুক্তি যখন ফুরিয়ে যায়, মাথা তখন গরম হয়ে যায়। একটা প্রবাদ আছে রেগে গেলেন তো হেরেই গেলেন। আমরা সবাই মিলে হাঁটতে চাই না, আমরা সবাই মিলে জিততে চাই। এজন্য সবাই যেন মাথাটা একটু ঠাণ্ডা রেখে যুক্তির সঙ্গে সত্যনির্ভর কথাগুলো বলি। তাতে অবশ্যই দেশবাসী উজ্জীবিত হবে। এই সংসদের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে এবং দেশটাকে নিয়ে সবাই মিলে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারবো।”
শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষে স্পিকার বলেন, “সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে যদি কোনও অসংসদীয় শব্দ বা অংশ থাকে, তবে তা কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী এক্সপাঞ্জ করা হবে।”
উল্লেখ্য এর আগে বিএনপি দলীয় একজন এমপি সংসদে বক্তব্যে বলেছিলেন – এই সংসদে বিএনপির অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন এখানে কিন্তু বিরোধীদল জামায়াতের আসনগুলোতে বসা কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই।
এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে স্পিকার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন – আমার সামনে বসা জামায়াতের এমপিকে আমি রণাঙ্গণে সরাসরি যুদ্ধে দেখেছি। জামায়াতের অনেক আরও অনেকেই আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।