• ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৭ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা চলার মধ্যে মার্কিন সামরিক বিমানে ঠাসা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ, রণপ্রস্তুতির আভাস

Usbnews.
প্রকাশিত মে ৪, ২০২৬
নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা চলার মধ্যে  মার্কিন সামরিক বিমানে ঠাসা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ, রণপ্রস্তুতির আভাস
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বখ্যাত উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষক ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে অস্বাভাবিক সংখ্যক মার্কিন সামরিক বিমান উড়ে যেতে দেখা গেছে। এই অঞ্চলে পাঠানো উড়োজাহাজগুলোর একটি বড় অংশই ভারী পরিবহন এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী (এরিয়াল রিফুয়েলিং) বিমান, যা এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে পাঠানো বিমানগুলোর মধ্যে সিংহভাগই হচ্ছে ‘সি-১৭এ গ্লোবমাস্টার–৩’ মডেলের শক্তিশালী সামরিক কার্গো উড়োজাহাজ। উল্লেখ্য, এই মডেলের প্রতিটি উড়োজাহাজ প্রায় ৭৭ টন ভারী যুদ্ধসরঞ্জাম এবং ১০০ জন সশস্ত্র সেনাসদস্য বহনে সক্ষম। অন্তত ১২টি এই ধরনের পরিবহন বিমান জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে বলে নিশ্চিত করেছে আল-জাজিরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার আহ্বান জানিয়েছেন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াডেফুল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মানির অবস্থান এ ক্ষেত্রে অভিন্ন। মার্কো রুবিওর মতো তিনিও মনে করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের পথ থেকে সরে আসতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দিতে হবে।

এদিকে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

গত ২৭ এপ্রিল ফ্রিডরিখ মের্ৎস যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটে ওয়াশিংটনের কোনো সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ দেখা যাচ্ছে না। উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক আলোচনায় তিনি মন্তব্য করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই সংঘাত থেকে বের হবে তা পরিষ্কার নয়।

পরিবহন বিমানের পাশাপাশি বোয়িং ‘কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটো ট্যাঙ্কার’ মডেলের জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজকেও ওই অঞ্চলের আকাশে সক্রিয় দেখা গেছে। ইসরায়েল এবং এর পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এ ধরনের অন্তত চারটি উড়োজাহাজ সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। এই বিশেষায়িত বিমানগুলোর উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, মার্কিন ফাইটার জেট বা বোমারু বিমানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে থেকে যে কোনো অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি এক নতুন সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কেউ কেউ একে সম্ভাব্য সংঘাতের মুখে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে দেখলেও, অনেকের মতে এটি অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং অনির্দিষ্ট অধ্যায়ের বা আশাব্যঞ্জক তবে গম্ভীর সূচনা হতে পারে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মাঝে এই বিশাল সামরিক লজিস্টিক সাপোর্ট মূলত যুদ্ধের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত বিপুল সংখ্যক সি-১৭ উড়োজাহাজের মাধ্যমে সরঞ্জাম পরিবহন মূলত কোনো বড় ধরনের সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করা অথবা নতুন কোনো ফ্রন্টে যুদ্ধের রসদ পৌঁছানোর অংশ হতে পারে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই অন্যতম বড় আকারের মার্কিন সামরিক মুভমেন্ট। আকাশপথে এই অস্বাভাবিক তৎপরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

ইরানের দেওয়া নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন ইরান যদি কোনো ‘অসদাচরণ’ করে, তাহলে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

শনিবার (২ মে) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান তাদের প্রস্তাবের পূর্ণ বিবরণ পাঠাচ্ছে এবং তিনি তা পরে বিস্তারিত জানাবেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, গত কয়েক দশকে ইরানের কর্মকাণ্ডের তুলনায় তারা এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি, ফলে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে।

ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ ও ফারস জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। এতে সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন কাঠামো গঠনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে চলতি সপ্তাহেই ইরানের আরেকটি প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন ট্রাম্প।