পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির, নিজের ডেরাতেও হারলেন মমতা।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই চমক দেখিয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটি পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে। এমনকি রাজ্যের টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হেরেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গত মার্চ মাসেই মমতা ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিজের ভবানীপুর আসনে জয়ী হবেন। এমনকি এক ভোটের ব্যবধান হলেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিজেপি নেতা ও তাঁরই একসময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাজিত হন।
গতকাল সোমবার গণনা শুরুর পর প্রথম দিকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন মমতা। সপ্তম দফা শেষে তিনি এগিয়েছিলেন ১৭ হাজারেরও বেশি। কিন্তু পরবর্তী দফাগুলোতে সেই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ১৪তম দফায় তা নেমে আসে ৪ হাজারের নিচে এবং শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
দক্ষিণ কলকাতার এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এবারের লড়াইটি মর্যাদার প্রশ্নে উচ্চ ঝুঁকির প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, যেখানে গণনা কেন্দ্রে দুই নেতাই উপস্থিত ছিলেন। এর মাধ্যমে মমতা দ্বিতীয়বারের মতো শুভেন্দুর কাছে হারলেন। ২০২১ সালেও মমতা নন্দীগ্রাম আসনে শুভেন্দুর কাছে প্রায় ২ হাজার ভোটে হেরে যান। পরে উপনির্বাচনের মাধ্যমে ভবানীপুরে ফিরে আসেন। ২০১১ সাল থেকে প্রতিটি বিধানসভা নির্বাচনে—ওই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া—তিনি এই আসনটির প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন।
এদিকে, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিধানসভার মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে গত নির্বাচনে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৭৭, এবারে ২০৬টি। আর গত নির্বাচনে মমতা যেখানে ২১৪ আসন পেয়েছিল, এবারে তাঁরা পেয়েছেন মাত্র ৮১টি আসন।
পূর্ব ভারতে নিজেদের অগ্রযাত্রা সম্পূর্ণ করার যে বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা, তাতে সফল বিজেপি। বহু প্রতীক্ষিত পশ্চিমবঙ্গ জয় তাদের নিশ্চিত। এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিজেপি তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের সামনে না এনে বা মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করে, নীরবে স্থানীয় মুখদের প্রার্থী করেছে। তারা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অবকাঠামো এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিয়েছে।
এই নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে মোট ৯১ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ২৭ লাখের বেশি ভোটার, যাদের বিষয়টি বিচারাধীন এবং ১৯টি ট্রাইব্যুনালে তাঁদের আপিল ঝুলে আছে। এই সংখ্যা মোট ভোটারের ১১.৬ শতাংশেরও বেশি, যা ২০২১ সালে তৃণমূলের ১০ শতাংশ ব্যবধানের জয়ের চেয়েও বড়।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিজের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর কেন্দ্রে অভাবনীয় পরাজয় বরণ করেছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১১৪ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন তিনি।
এই জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, মুসলিমরা ঢালাওভাবে মমতাকে ভোট দিলেও হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংহতির কারণেই তার এই জয় সম্ভব হয়েছে এবং এটি মূলত হিন্দুত্ববাদের জয়’।
‘মুসলিমরা সরাসরি মমতাকে ভোট দিয়েছে, আমার জয় হিন্দুত্ববাদের জয়’
সোমবার (৪ মে) ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনার শুরুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে যেতে থাকে। সপ্তম রাউন্ড শেষে তিনি ১৭,০০০ ভোটের লিড পেলেও ১৪তম রাউন্ডে তা ৪,০০০-এর নিচে নেমে আসে। শেষ পর্যন্ত সব ব্যবধান ঘুচিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন শুভেন্দু অধিকারী। দক্ষিণ কলকাতার এই কেন্দ্রটি ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে এবার বড় ধরনের ভাঙন ধরল।
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এটি তার রাজনৈতিক জীবনের অবসর। মুসলিমরা তাকে খোলাখুলি ভোট দিয়েছে। বিশেষ করে ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের মতো মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে তারা মমতার পক্ষ নিয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু, শিখ, জৈন ও বৌদ্ধরা আমাকে আশীর্বাদ করে জয়ী করেছেন। এই জয় আসলে হিন্দুত্ববাদের জয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাঙালি হিন্দুরা ছাড়াও গুজরাটি, মারওয়াড়ি, শিখ ও পূর্বাঞ্চলীয় ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কয়েকবার ফোন করে ভবানীপুর নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন, আমি তাকে জয়ের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছি।’ শুভেন্দু এই জয়কে ‘অরাজক শাসকের’ বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে আখ্যা দেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামের পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর কেন্দ্রে পরাজয়ের পর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি এই ফলাফলকে ‘অনৈতিক জয়’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি মিলে শতাধিক আসন ‘লুট’ করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভবানীপুর থেকে প্রায় ৬০,০০০ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে ‘পদ্ম’ ফুটেছে, জনশক্তির জয় হয়েছে: মোদি
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল জয়ের পর এক আবেগপূর্ণ বার্তায় রাজ্যবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার (৪ মে) নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলের প্রবণতায় বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি মূলত জনগণের শক্তির জয় এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন।” তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান যে, তিনি তাদের ভালোবাসার কাছে মাথা নত করছেন।
নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, “বাংলার মানুষ বিজেপিকে যে অভূতপূর্ব জনদেশ (ম্যান্ডেট) দিয়েছে, তার মর্যাদা আমরা রক্ষা করব। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার উপহার দেব যা সমাজের সকল স্তরের মানুষের উন্নয়ন, সুযোগ এবং আত্মমর্যাদা নিশ্চিত করবে।”
ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ মমতা, বললেন, ‘বিজেপি-ইসিআই ১০০ আসন লুট করেছে’
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো সরকার গড়তে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই পরাজয়কে ‘অনৈতিক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দলটির প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার (৪ মে) সন্ধ্যায় কলকাতায় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে শতাধিক আসন ‘লুটে’র অভিযোগ তোলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন মিলে ১০০টিরও বেশি আসনে কারচুপি করেছে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমি এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এটি কোনো নৈতিক জয় নয়, বরং কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহায়তায় যা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।’ তৃণমূল সুপ্রিমো পরাজয় মেনে না নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আরও বলেন, ‘আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াব।’
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয়কে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল সুশাসনের রাজনীতির জয় হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
অপদস্থ মমতা, সংঘর্ষ, ভাঙচুর , অগ্নিসংযোগ
গতকাল চূড়ান্ত ফল আসার আগেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জয় উদ্যাপন শুরু করেন বিজেপির কর্মীরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের বাইরে একদল বিজেপি কর্মী ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেন। এ ছাড়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়াকে ঘিরে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। মমতার গাড়ি কেন্দ্রে পৌঁছানোমাত্র বিজেপির একদল কর্মী তাঁর উদ্দেশে ‘চোর’ বলতে থাকেন। ঘটনার আকস্মিকতায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা এর প্রতিবাদ করলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এদিকে তৃণমূল কর্মীদের পুলিশ এলাকা ছাড়তে বললে তার কিছু পরেই বিশাল মিছিল নিয়ে হাজির হন বিজেপি সমর্থকেরা। এরপরই পুলিশের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় চেয়ার ভাঙচুর এবং একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরেক কেন্দ্র জগদীশচন্দ্র বোস কলেজের সামনেও ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। কলেজের ভেতরে ছিলেন তৃণমূল কর্মীরা। আর বাইরে লাঠি হাতে বিজেপি কর্মীদের মহড়া দিতে দেখা যায়।
এ ছাড়া গতকাল পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সচিবালয় নবান্নের সামনে বিজেপির একদল নারী কর্মী পৌঁছে স্লোগান দিতে থাকেন। কোচবিহারের দিনহাটায় বিজেপি ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিপেটা করে পুলিশ।