ইতিহাসে যেসব ঘটনা প্রবাহ মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ এবং একই সাথে নৈতিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে উজ্জীবিত রাখতে ক্রিয়াশীল এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করে ১৮৩১ সালের ৬ মে’র ঐতিহাসিক বালাকোট যুদ্ধ এসবের অন্যতম।
আজ ৬ মে বুধবার ‘বালাকোট দিবস’-এর সাড়ে ৫শ ভারত শাসনের পর মুসলিম শাসকদের নৈতিক অধঃপতন শুরু হয়। তাওহীদ, রেসালত, আখেরাত, ইসলামী সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ দেখা দেয়। একই সাথে মুসলিম সমাজে শিরক-বিদআতের বিস্তৃতি ঘটে ব্যাপকভাবে। সঙ্গত কারণেই তখন হিন্দু-মুসলিম পার্থক্য করা একেবারেই সহজসাধ্য ছিলো না। শাসকগোষ্ঠী এতোই ভোগ-বিলাসী হয়ে উঠেছিলেন যে, ইংরেজরা দেশ দখল করে নিলেও তারা হেরেম থেকে বের হওয়ার ফুরসৎ পেতেন না। সে ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজের পতন এবং ১৯৭১ সালে টিপু সুলতানকে ইংরেজরা হত্যা করে। ১৮০৫ সালে ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয়। এ ষড়যন্ত্রে হিন্দু, শিখ, মারাঠা ও একশ্রেণির দালাল মুসলমান জমিদাররাও জড়িত ছিলেন। মুসলমানদের নৈতিক অধঃপতন, নিজেদের মধ্যে অনৈক্য এবং নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে মুসলমানদের পতন ঘটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের গোরাপত্তন হয়েছে। মূলত, বালাকোট যুদ্ধ ছিলো আমাদের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার এক প্রাণান্তকর লড়াই।
এমন দুর্দিনে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। তার ইন্তিকাল পরবর্তী তার ৪ যোগ্য সন্তান একাজে যৌগ্যতর আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। এক পর্যায়ে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দেসে দেহলভী একটি বিপ্লবী ফতোয়া জারি করে বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশ ‘দারুল হরব’। তাই এখানে জিহাদ করা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য ফরজ। এ ফতোয়ার পর ভারতীয় মুসলমান সমাজে জিহাদী যযবা সৃষ্টি হয়। একাজে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করেন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী, মাওলানা আব্দুল হাই, মাওলানা ইসমাঈল শহীদ। ১৮৩১ সালের ৬ মে মহারাজা রঞ্জিত সিং ও সাইয়েদ আহমাদ বেরলভি বাহিনীর মধ্যে বালাকোটের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে শিখ সৈন্যরা সাইয়েদ আহমাদ বেরলভির শিরোচ্ছেদ করে। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী না হলেও তা মুসলিম উম্মাহর প্রেরণার উৎসা।
বালাকোটের যুদ্ধ ছিলো উপমহাদেশের মুসলমানদের আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার এক সংগ্রাম। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রেক্ষাপটে বালাকোটের শিক্ষা এখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বালাকোটের প্রেরণা ও জুলাই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ন্যায়, ইনসাফ ও জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালানোর আহবান ।