গত দুই মাসের যুদ্ধে একের পর এক হামলা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা আগের মতোই রয়ে গেছে। হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষতির পরিমাণও সীমিত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে। এদিকে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উত্তেজনা এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটও তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সাম্প্রতিক হামলার পরও বড় ধরনের নতুন ক্ষতি হয়নি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সময়সীমা আগের মতোই রয়েছে। একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে এখনো প্রায় ৯ মাস থেকে এক বছর সময় নিতে পারে, যা গত বছরের হিসাবের তুলনায় প্রায় একই। ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ বন্ধ করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করলেও তেহরানের সেই সক্ষমতায় বড় কোনো আঘাত হানতে পারেনি মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ।
জানা গেছে, গত দুই মাসের যুদ্ধে একের পর এক হামলা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সময়সীমা আগের মতোই রয়ে গেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের প্রয়োজনীয় সময় গত বছরের গ্রীষ্মকালের পরিস্থিতির মতোই আছে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের পরমাণু সক্ষমতাকে প্রায় এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এরপর চলতি বছর দুই মাস ধরে নতুন করে যুদ্ধ চললেও সেই সময়সীমার কোনো নড়চড় হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তার একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো । তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো মূলত প্রচলিত সামরিক অবকাঠামো ও লক্ষ্যবস্তুতে কেন্দ্ৰীভূত ছিল। ইসরাইল কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালেও, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বেশি গুরুত্ব দিয়েছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প ধ্বংসের ওপর । ফলে পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উপাদান বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেশির ভাগই অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আরো সমৃদ্ধ করলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে । তবে এই মজুতের অবস্থান পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যকরভাবে থামাতে হলে শুধু স্থাপনা ধ্বংস করলেই হবে না; বরং অবশিষ্ট ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া বা ধ্বংস করা প্রয়োজন ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বলছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। তবে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে। গোয়েন্দাদের মতে, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সত্যিকার অর্থে পঙ্গু করতে হলে তাদের কাছে থাকা এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হয় ধ্বংস করতে হবে, না হয় সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
গত জুনে মার্কিন হামলায় নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্পাহানের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগস্ত হয়। তবে আইএইএ এখনো ইরানের ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার (৬০ শতাংশ) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো হদিস পায়নি। সংস্থাটির ধারণা, এই মজুতের অর্ধেকটাই ইস্পাহানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের একটি দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ টানেলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ঐ কেন্দ্রে পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত থাকায় বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। আইএইএর মতে, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব ।
গত জুনের সামরিক অভিযান এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধের যোগসূত্র টেনে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, অপারেশন মিডনাইট হ্যামার ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেই সাফল্যকে ভিত্তি করেই শুরু হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, যা ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এক সময় এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা পরমাণু অস্ত্রের পথে এগোচ্ছিল।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরেই একটি বিষয়ে স্পষ্ট, ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র হাতে পাবে না। আর তিনি কোনো ফাঁকা বুলি আওড়ান না। তবে, এ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিচালকের দপ্তর। একই সুরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না । এটাই এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রুয়ার মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলায় পরমাণু কেন্দ্রগুলো গুরুত্ব না পাওয়ায় ইরানের সক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হয়নি ।
তিনি বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক উপদান মাটির এত গভীরে লুকিয়ে রেখেছে যে সাধারণ বোমা দিয়ে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ‘গ্রাউন্ড রেইড’ বা সরাসরি স্থল অভিযানের কথা ভাবছেন। ইস্পাহানের ভূগর্ভস্থ টানেল থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে । সামরিক হামলার পাশাপাশি ইসরাইল কর্তৃক ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যার ঘটনা তেহরানকে চাপে ফেলেছে।
জাতিসংঘের সাবেক পরমাণু পরিদর্শক এবং ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো তেহরানের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে তারা যদি শেষ পর্যন্ত কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরিও করে, তবে সেটি আদতে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।