যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং বেইজিংয়ে তাদের বহুল আলোচিত দুই ঘণ্টাব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) স্থানীয় সময় দুপুরে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে মূলত দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সংঘাত, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
যদিও এই সফর ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ছিল, তবে বড় ধরনের কোনো নাটকীয় সাফল্যের খবর এখনও পাওয়া যায়নি। বৈঠক শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্মানে একটি বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন শি জিনপিং।
বৈঠকের একপর্যায়ে তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন শি জিনপিং। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি জিনপিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মতভেদ দুই পরাশক্তিকে সরাসরি সংঘর্ষ বা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পুতিনের সফরের প্রস্তুতির খবরটি এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বেইজিং সফরে রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পকে বহনকারী ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বেইজিংয়ে অবতরণ করে। গত এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম চীন সফর। বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘ বৈঠকে ইরান সংকট, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে ট্রাম্পের এই সফরটি আগে একবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চা-চক্র ও মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে ট্রাম্প তার সফর শেষ করবেন। ঠিক এই মুহূর্তেই ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে পুতিনের সফরের ঘোষণা আসাটা বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বৈঠক ট্রাম্পের
বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চীন সফরের প্রথম দিনে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় এই মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম এএফপি জানিয়েছে চীন সফরের প্রথম পূর্ণ দিনে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত জমকালো রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আজ সারাদিন চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের খুবই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের আতিথেয়তার প্রশংসা করে বলেন, এই সন্ধ্যা বন্ধুদের মধ্যে খোলামেলা আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছে। তিনি শি’কে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণও জানান। ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট শি, আপনাকে এবং মাদাম পেং লিউয়ানকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানাতে পেরে আমি গর্বিত। আমরা আপনাদের অপেক্ষায় থাকব।
ভোজসভায় ট্রাম্প আরও বলেন, আমেরিকান ও চীনা জনগণের মধ্যে সমৃদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আজ যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর। আপনার সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য সম্মানের।’
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান। কঠোর পরিশ্রম, সাহস ও সাফল্যের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ দুই দেশকে এক করে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে বিশ্ব এক অনন্য রূপ পায়।’
উল্লেখ্য, গত নয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে অবস্থান করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প-শির বৈঠকে দেখা গেল চীনে নিষেধাজ্ঞায় থাকা রুবিওকে
বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। চীনের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কারণে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বেইজিং। এর আওতায় দেশটিতে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব পিপল’–এ প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে ট্রাম্পের অন্য সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ছিলেন রুবিও। এ নিয়ে এখন কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা চলছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুবিওর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছে চীন নিজেই। কৌশলগতভাবে তাকে একটি নতুন চীনা নাম ব্যবহার করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না করেই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
২০২০ সালে যখন রুবিও সিনেটর ছিলেন, তখন হংকং ও জিনজিয়ান ইস্যুতে চীনের সমালোচনার জেরে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় বেইজিং। টেড ক্রুজসহ আরও কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতার ওপরও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রুবিওকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার পর চীন সফরের বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। গত মার্চ মাসে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছিলেন, প্রয়োজনে রুবিওর বিরুদ্ধে থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই পথেই সমাধান হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ট্রাম্পের এত গুরুত্বপূর্ণ সফরে রুবিওকে বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। চীনও কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সামাল দিয়ে দুই দেশের বৈঠক সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অস্ত্র সহায়তার অনুমোদন দিয়েছিল, যদিও সেই অস্ত্রের সরবরাহ এখনও শুরু হয়নি। বেইজিং এই পদক্ষেপকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে আসছে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সফরে মূলত বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পরিমাণে কৃষি পণ্য এবং যাত্রীবাহী বিমান ক্রয়ের বিষয়ে একমত হবে। গত বছর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা নিরসনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ বোর্ড গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় যে টান পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এই চীন সফর তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও এই দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। দীর্ঘ দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করতে ট্রাম্প চীনের প্রভাব খাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সম্মেলনের আগে তিনি তার সেই কড়া সুর কিছুটা নরম করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, সে জন্য বেইজিং তেহরানকে কোনো চাপ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। দুই দেশের এই শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা মূলত সম্পর্কের টানাপড়েন কমিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।