• ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী হত্যা : রাজধানীতে প্রবাসীর ৮ টুকরা মরদেহ উদ্ধার , গ্রেফতার ২জন , মূল আসামি পলাতক

Usbnews.
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী  হত্যা : রাজধানীতে প্রবাসীর ৮ টুকরা মরদেহ উদ্ধার , গ্রেফতার ২জন , মূল আসামি পলাতক
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

মোহাম্মদ আহাদ মিয়া ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি :   রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে হত্যার পর মরদেহ আট টুকরো করে পলিথিনে ভরে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখার ঘটনায় এক লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে র‍্যাব। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার ১৩ বছর বয়সী মেজো মেয়েকে নরসিংদী সদর উপজেলার নন্দরামপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৩। তবে ঘটনার মূল হোতা ও পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক রয়েছেন।

গত ১৪ মে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মোকাররম। এরপর গতকাল রোববার (১৭ মে) মান্ডার প্রথম গলির আব্দুল করিম রোডের ২৬০/১ নম্বর ‘শাহনাজ ভিলা’র বেজমেন্ট থেকে মরদেহের সাতটি অংশ উদ্ধার করা হয়। তবে মাথা তখনো পাওয়া যায়নি। পরে রোববার রাত আড়াইটার দিকে বাসার পাশের ময়লার স্তূপ থেকে মাথাটি উদ্ধার করেন পুলিশ।

গত ১৪ মে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মোকাররম। এরপর গতকাল রোববার (১৭ মে) মান্ডার প্রথম গলির আব্দুল করিম রোডের ২৬০/১ নম্বর ‘শাহনাজ ভিলা’র বেজমেন্ট থেকে মরদেহের সাতটি অংশ উদ্ধার করা হয়। তবে মাথা তখনো পাওয়া যায়নি। পরে রোববার রাত আড়াইটার দিকে বাসার পাশের ময়লার স্তূপ থেকে মাথাটি উদ্ধার করেন পুলিশ।

সোমবার (১৮ মে) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মুগদা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আবু রায়হান মোকাররমের চাচাতো ভাই রিফাতের কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দেন। মোকাররমের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম সোহরাব মিয়া। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন।

উঠে এলো লোমহর্ষক তথ্য

সোমবার (১৮ মে) বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে র‍্যাব-৩ সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, হত্যাকাণ্ডের পর মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে ঘাতকরা। এর মধ্যে সাত টুকরো ভাড়াবাসার নিচে ময়লার স্তূপে এবং মাথার অংশটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেওয়া হয়। আরও প্যান্ট শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, এই নৃশংস ঘটনার পরদিন অভিযুক্ত হেলেনা বেগম, তার মেয়ে ও পলাতক তাসলিমা বাইরে ঘুরতে গিয়ে হোটেলে বিরিয়ানি খান এবং রাতে বাসায় ফিরে প্রতিবেশীদের ডেকে ছাদে উৎসব বা পার্টি করেন।

এর আগে রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত মরদেহের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।সোমবার (১৮ মে) এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ এর কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী।এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যমতে নিহত ব্যক্তির মাথা উদ্ধার করা হয়। মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী বলেন, আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। বিকেলে এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।

র‌্যাব জানায়, নিহত ব্যক্তির প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাত বলা হলেও মাথা উদ্ধারের পর তার পরিচয় জানা গেছে।তার নাম মুকাররম হোসেন। তিনি সৌদি প্রবাসী। মুকাররম এক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন।

প্রেমিকা কৌশলে তাকে ঢাকায় এনে একসঙ্গে বান্ধবীর বাসায় ওঠেন। এরপর ঘুমের ওষুধ খাওয়ালে মুকাররম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে বান্ধবী হত্যার উদ্দেশে তাকে আঘাত করেন। এরপর তার শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে টুকরা টুকরা করা হয়।

র‌্যাব জানায়, ৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে প্রেমিকা ও তার বান্ধবী মিলে মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।পরে তার মরদেহ আট টুকরা করে ময়লার মধ্যে ফেলে দেন।

র‌্যাব আরও জানায়, ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদঘাটন ও এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।আরও একজনকে গ্রেপ্তারের অভিযান চলমান। এ কারণে গ্রেপ্তারকারীর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

মুগদা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আবু রায়হান বলেন, রোববার (১৭ মে) বিকালে মান্ডা আব্দুল গনি রোডের শাহনাজ ভিলার সামনে বেজমেন্টের নিচ থেকে আলাদা করে পলিথিনে মোড়ানো অর্ধগলিত মরদেহের মাথা বিহীন সাতটি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়। আইনিপ্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য বিকালে মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছিল ।

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা মোকাররমের সাথে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সাথে মোকাররমের পরিচয় ও পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রবাসে থাকাকালীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি প্রেমিকা তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দেন মোকাররম। গত ১৩ মে নিজের বাড়িতে কোনো কিছু না জানিয়ে মোকাররম বাংলাদেশে নেমে সরাসরি চলে যান মুগদার মান্ডা এলাকায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা আক্তারের ভাড়া বাসায়। এক রুমের সেই বাসায় তাসলিমা, মোকাররম, হেলেনা এবং তার দুই মেয়ে একসাথে অবস্থান করছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ হিসেবে র‍্যাব জানায়, ১৩ মে রাতে মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে তীব্র মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে হেলেনার ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সাথে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করলে হেলেনা তা দেখে ফেলেন। এই নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে ওই রাতেই তাসলিমা ও মোকাররমের বিয়ে নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়।   মোকাররম বিয়ে করতে চাইলেও তাসলিমা রাজি হননি, যার ফলে মোকাররম তার দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা ফেরত চান এবং তাসলিমার ব্যক্তিগত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।

এই বিরোধের জেরে হেলেনাকে সাথে নিয়ে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তাসলিমা। মেয়ের ওপর ক্ষোভ থেকে হেলেনাও এতে রাজি হন। পরিকল্পনা মোতাবেক ১৪ মে সকালে নাশতার সাথে মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। মোকাররম ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে হেলেনা তাকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। প্রাণ বাঁচাতে মোকাররম হেলেনার হাতে কামড় দিলে তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেন। মোকাররম হাতুড়ি ছিনিয়ে নিয়ে উল্টো তাসলিমাকে আঘাত করতে গেলে পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় রূপ নেয়।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হেলেনা বঁটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং তার মেজো মেয়ে হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় আঘাত করে। পরে তাসলিমা ধারালো বঁটি দিয়ে আরও তিন-চারবার আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সবাই মিলে বাথরুমে মরদেহ নিয়ে রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করেন এবং বাইরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে বস্তায় ভরে রাখেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ১৪ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুযোগ বুঝে মরদেহের সাত টুকরো নিচে ময়লার স্তূপে এবং মাথার অংশটি এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেওয়া হয়।

হত্যাকাণ্ড ও ছাদ পার্টির পর ১৬ মে তাসলিমা তার ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান এবং ১৭ মে হেলেনা তার দুই মেয়েকে নিয়ে কাজে যোগ দেন। তবে ১৭ মে দুপুরে মরদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে এলাকাবাসী ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহের টুকরোগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র শনাক্ত করে মোকাররমের পরিচয় নিশ্চিত করে।

ঘটনাটি নজরে আসার পর র‍্যাব-৩ গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত হেলেনা আক্তার ও তার মেজো মেয়েকে গ্রেপ্তার করে। হেলেনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে মোকাররমের মাথার অংশটি উদ্ধার করা হয়। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অন্য আসামি তাসলিমাকে গ্রেপ্তারে র‍্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।