ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডের দিকে রওনা হওয়া একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণবাহী নৌবহরের ৩৯টি জাহাজ পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আটকে দিয়েছে ইসরায়েলি নৌবাহিনী। তবে বহরের বাকি জাহাজগুলো ইসরায়েলি বাধা উপেক্ষা করেই গাজার উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রেখেছে।
সোমবার (১৮ মে) আন্তর্জাতিক ত্রাণ বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-এর আয়োজকরা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে সোমবার ভোরের দিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা গাজার ওপর আরোপিত আইনি নৌ অবরোধের কোনো ধরনের লঙ্ঘন বরদাস্ত করবে না।
এ দিকে ত্রাণ বহরের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর এমন সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এই ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই আন্তর্জাতিক বহরে থাকা তুর্কি নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
আয়োজক সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি দেশের ৪২৬ জন অধিকারকর্মী নিয়ে মোট ৫৪টি জাহাজের এই বিশাল আন্তর্জাতিক ত্রাণ বহরটি গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ তুরস্কের একটি বন্দর থেকে গাজার উদ্দেশ্যে তৃতীয়বারের মতো রওনা হয়েছিল।
সোমবার আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজা থেকে প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজগুলো আচমকা এই বহরকে ঘিরে ফেলে এবং দিনের আলোতেই প্রথম জাহাজটিতে সামরিক কমান্ডোরা চড়াও হয়। আটক হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত ৪৪ জন তুর্কি নাগরিক রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযানকে একটি ‘উস্কানি’ বলে দাবি করেছে এবং বহরে থাকা সবাইকে অবিলম্বে পথ পরিবর্তন করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ত্রাণ বহরে থাকা ‘লার্ক’ নামক জাহাজে অবস্থানরত তুর্কি অধিকারকর্মী আহমেদ সোইলেমেজ জাহাজের ভেতর থেকে সরাসরি যুক্ত হয়ে জানান, তাঁরা ইসরায়েলি বাহিনীর এই বাধায় একেবারেই ভীত নন। তবে ইতিমধ্যে যে ৩9টি জাহাজ ও তার আরোহীদের ইসরায়েলি সেনারা ধরে নিয়ে গেছে, তাদের নিরাপত্তা ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। একটি লাইভ ট্র্যাকিং ম্যাপে দেখা গেছে, লার্ক নামক জাহাজটি তখনো গাজা থেকে প্রায় ২১৫ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল এবং গাজার আরও কাছে পৌঁছামাত্রই তাদেরও আটকে দেওয়া হতে পারে বলে ক্রু সদস্যরা আশঙ্কা করছেন।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার এটিই প্রথম প্রচেষ্টা নয়। এর আগে গত ১২ এপ্রিল স্পেন থেকে রওনা হওয়া তাদের একটি ত্রাণ বহরকে মাঝসমুদ্রেই আটকে দিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী এবং ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীকে গ্রিসের ক্রিত দ্বীপে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারও আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে এই একই সংগঠনের আরেকটি বড় ত্রাণ বহর মাঝপথেই আটকে দেয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং সেখান থেকে বিশ্বখ্যাত জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ৪৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গত বছরের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়েছিল, যেখানে গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর স্পষ্ট গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি নাগরিক, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং তুরস্কসহ একাধিক দেশ অভিযোগ করেছে যে গাজায় বর্তমানে যে পরিমাণ রসদ পৌঁছাচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই সামান্য।
গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষের সিংহভাগই বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে বোমায় বিধ্বস্ত বাড়িঘর কিংবা তাঁবুতে অত্যন্ত অমানবিক জীবনযাপন করছেন। তবে গাজা উপত্যকার সমস্ত প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণকারী দেশ ইসরায়েল ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেওয়ার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ১৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি মানবিক সহায়তা এবং হাজার হাজার টন চিকিৎসা সামগ্রী গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স