• ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা: হিন্দু গোপালকদের বিপদে ফেলল বিজেপি

Usbnews.
প্রকাশিত মে ২১, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা: হিন্দু গোপালকদের বিপদে ফেলল বিজেপি
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের একটি নতুন নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি কয়েকটি দপ্তর থেকে গবাদিপশুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার সার্টিফিকেট ছাড়া গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধ করায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক মুখে এই নির্দেশিকা জারি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন হিন্দু গরু পালনকারী এবং মুসলিম ক্রেতা উভয় পক্ষই।

এই সিদ্ধান্ত যে রাজ্য বিজেপিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে, তা স্বীকার করছেন খোদ দলেরই সংখ্যালঘু নেতারা। গত ৯ মে শপথ নেওয়ার মাত্র চার দিন পর, অর্থাৎ ১৩ মে বিজেপি সরকার এই বিতর্কিত নির্দেশিকা জারি করে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটগুলোতে এক ধরনের আতঙ্ক ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রভাবশালী বিজেপি নেতা ও সংখ্যালঘু সেলের সহসভাপতি ইউনুস আলী গণমাধ্যমকে জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে দল কিছুটা রাজনৈতিক সমস্যায় পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির সমীকরণ তুলে ধরে তিনি বলেন পশ্চিমবঙ্গে মূলত হিন্দু সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে ‘ঘোষ’ সমাজ গরু লালন-পালন ও দুগ্ধ ব্যবসার সাথে জড়িত। গরুর বয়স বেড়ে গেলে বা অর্থের প্রয়োজনে হিন্দু খামারিরা তা বিক্রি করেন এবং সাধারণত মুসলিমরা সেই গরু কেনেন। ইউনুস আলীর মতে, এই অর্থনৈতিক চক্রটি বুঝতে সরকারের কিছুটা ভুল হয়েছে, যার কারণে এই বিভ্রান্তি।

খামারিরা যদি লোকসানের মুখে গরু পালন বন্ধ করে দেন, তবে মিষ্টি, দই ও ছানার মতো দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে ধস নামবে, যা শিল্পে অনুন্নত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলবে।

এদিকে এই ইস্যুটিকে হাতিয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বেশ কিছু বিস্ফোরক তথ্য ও প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, “বিজেপি সরকার একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে এই কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে ঘোষ, দাস ও মুসলিমসহ সব গরিব মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। চোটটা আসলে সব গরিব মানুষের গায়েই লেগেছে।”

মহুয়া মৈত্রের উত্থাপিত মূল প্রশ্নসমূহ:

মাংস রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়: পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর উদ্ধৃত করে তিনি দেখান, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ভারত মাংস রপ্তানি করে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।

কর্পোরেট অনুদান: মহিষের মাংস বিক্রির বড় করপোরেট সংস্থা ‘অ্যালানা গ্রুপ’ বিজেপির তহবিলে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।

দ্বিমুখী নীতি: মহুয়ার প্রশ্ন, কর্পোরেট থেকে অনুদান নেওয়া বা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করায় যদি বাধা না থাকে, তবে বাংলার সাধারণ গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে এই ব্যবসা বন্ধ করার চেষ্টা কেন?

সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে গ্রামীণ খামারিদের করুণ চিত্র। বিশেষ করে হিন্দু গোপালক পরিবারের নারীরা ক্যামেরার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

তাদের বক্তব্য, বছরের এই কোরবানির ঈদের সময়ে গরু বিক্রি করে তারা এককালীন ভালো টাকা রোজগার করেন। এই টাকা দিয়ে তারা সাধারণত কৃষিঋণ এবং বিভিন্ন মাইক্রোক্রেডিট (ক্ষুদ্রঋণ) সংস্থা থেকে নেওয়া চড়া সুদের ধার মেটান। খামারিদের অনেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই বিধিনিষেধ দ্রুত শিথিল করা না হলে তাদের সামনে আত্মহত্যা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

চাপের মুখে থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বিজেপি নেতারা। ইউনুস আলী জানান, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তার সাথে যোগাযোগ করছেন এবং এর ফলে তার ওপর এক ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, বিজেপি মূলত হিন্দুদের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে, তাই হিন্দু ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে তারা কিছু একটা করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উল্টো সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ওপর আস্থা রেখে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ঈদুল আজহার আগেই সরকার আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান সূত্র বের করবে।