• ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

রক্তাক্ত জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ১, ২০২৬
রক্তাক্ত জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের এই সুসংগঠিত আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের লড়াই ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল নৈতিক ও সামাজিক জাগরণ। শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিলেন যে তারা সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে কতটা সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ। রাষ্ট্র যখনই মেধার অবমূল্যায়ন করে কোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চায়, সমাজ যে তা দীর্ঘমেয়াদে মেনে নেয় না । ১ জুলাইয়ের ঘটনা ছিল তারই এক শক্তিশালী ও অমোঘ বার্তা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১ জুলাই তাই কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়, এটি একটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনার অবিচ্ছেদ্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

সংসদে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা আইন' পাস | আমার দেশ

আজ ১ জুলাই। ২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হয় ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন মূলত ১ জুলাই থেকে ধীরে ধীরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। আর ছাত্র-জনতার অবিরাম রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে।

শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে তখন স্লোগান ছিল – ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘মেধার মান দাও, কোটার অবসান চাও’, ‘সমান সুযোগ, ন্যায্য অধিকার’, এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।

বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে কোটা সংস্কার আন্দোলন

শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানকে ইস্যু করে একে একে উস্কানীমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাদের, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল,  মোহাম্মদ এ আরাফাতসহ অনেকেই।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার এক বক্তব্য বলেন, ‘এসব রাজাকারদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেদিনের সেই ছাত্র বিক্ষোভকে গুরুত্ব না দিয়ে ওবায়দুল কাদের ও তার দল যে রাজনৈতিক অহংকার দেখিয়েছিলেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১ জুলাইয়ের সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মাত্র ৩৬ দিনের মাথায় ওবায়দুল কাদেরসহ পুরো সরকারের শীর্ষ নেতাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।

হাসিনার দুঃশাসন ও পতন নিয়ে আল জাজিরার বিশেষ তথ্যচিত্র

‘রাজাকারের নাতি-পুতি’
চীন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করলে, সেদিন রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন, ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ তার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সেদিন রাতেই উত্তাল হয়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন, ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতন: ইতিহাসে ৩৬ জুলাই

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। ২০১৮ সালে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ সেই পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনরায় বহাল হয়ে যায়।

আগ্রাসী ছাত্রলীগ রক্তাক্ত শিক্ষার্থী

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষে নিহত ৬

হাইকোর্টের এই রায়ের পর পরই ৫ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন। এরপর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সরকারকে দাবি মানার জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত একটি আলটিমেটাম বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ৯ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো মাসজুড়ে চলে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার নেপথ্য কাজ। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সংস্কার বা বাতিলের কোনো কার্যকর ঘোষণা না আসায় ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় চূড়ান্ত ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতন | কালবেলা

২০২৪ সালের ১ জুলাই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ (চবি) বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ মিছিল করেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যার মধ্য দিয়ে কোটাবিরোধীর মতো অরাজনৈতিক একটি আন্দোলন রূপ নেয় রাজনৈতিক আন্দোলনে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচার পতনের এক দফা দাবি ছিল উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক আর দৃপ্ত সাহসের নাম, যার ইতি ঘটে ৫ আগস্ট। বাংলার ছাত্র-জনতার কাছে যে দিনটি ৩৬ জুলাই বা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নামে পরিচিত।

আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট

এক নজরে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনাবলী সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো,-

৬ জুন: কোটা বাতিল করে আদালতের রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামেন শিক্ষার্থীরা।

৯ জুন: হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

১-৬ জুলাই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে সংগঠিত হয় এবং সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে ২০১৮ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি পুনঃবহালের দাবিতে টিএসসি এলাকায় একটি বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

পরের কয়েকদিন দেশের অন্যান্য অংশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাস ও এর আশপাশে মিছিল-সমাবেশ করে।

গত ৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৫ জুন হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন ৬ জুলাই শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ডাক দেয়।

৭ জুলাই: সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করা হয়। ব্যাপক বিক্ষোভে অচল হয়ে যায় রাজধানী। পরের দিনও ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

৯ জুলাই: সারা দেশে সড়ক ও রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সকাল-সন্ধ্যা ব্লকেড অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোটা বহাল রেখে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে আইনজীবীর মাধ্যমে পক্ষভুক্ত হন দুই শিক্ষার্থী।

১০ জুলাই: কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের আদেশের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা, ৭ই আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ।

১৪ জুলাই: কোটা পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ। এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলা ‘রাজাকার’ শব্দটির জের ধরে রাতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

১৫ জুলাই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগসহ সরকার সমর্থকরা।

১৬ জুলাই: সারা দেশে দিনভর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার সমর্থকরা। এতে নিহতের ঘটনা ঘটে। রংপুরে আন্দোলনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের বুলেটে নিহত হন।

বিকেলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আন্দোলন যাবে, আন্দোলন আসবে। কিন্তু ছাত্রলীগ থাকবে’।

১৭ জুলাই: আগের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের বের করে দিয়ে কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়।
এদিন বিক্ষোভের কেন্দ্রের ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন শেখ হাসিনা  । শীর্ষ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি। রাতেই যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘাতের সূত্রপাত হয়। যাত্রাবাড়ীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ওই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।

১৮ জুলাই: দেশব্যাপী প্রতিরোধ, সহিংসতা, সংঘর্ষ ও গুলি করা হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশ ছিল প্রায় অচল। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পালটাপালটি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন অনেকেই। ফলে সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এদিন রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা জানান, ৯ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত চলবে ‘শাটডাউন’।

২০ জুলাই: শনিবার দেশজুড়ে কারফিউ, সেনা মোতায়েন করা হয়। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলবে। এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

২১ জুলাই: সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল (রদ ও রহিত) করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় প্রদান। রায়ে বলা হয়, কোটাপ্রথা হিসাবে মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। একই দিন চার দফা দাবি পূরণের জন্য বৈষম্যবারোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন।

২২ জুলাই: সোমবার কোটাপ্রথা সংস্কার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করা প্রজ্ঞাপনে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। রাতে সীমিত আকারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু হয়।

 

২৪ জুলাই: বুধবার ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কোটা আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের খোঁজ পাওয়া যায়। নিখোঁজ থাকার পাঁচ দিন পর আসিফ ও বাকেরকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দুজনই জানায়। আর রিফাত আত্মগোপনে আছে বলে জানানো হয়।

২৫ জুলাই: বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় ছুটির দুদিন-শুক্র ও শনিবার কারফিউ শিথিল থাকবে ৯ ঘণ্টা।

২৬ জুলাই: এলাকা ভাগ করে চলে ‘ব্লক রেইড’। চলে সারা দেশে অভিযান। সারা দেশে অন্তত ৫৫৫টি মামলা।গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছয় হাজার ২৬৪। চট্টগ্রামে ৩০ শিক্ষার্থী গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ককে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে নিজেদের হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অপর দুই সমন্বয়ক হলেন আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার।

২৭ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরও দুই সমন্বয়ককে হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তারা হলেন সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। গুরুতর আহত চিকিৎসাধীন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। হাসপাতালে আহতদের দেখার পর সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও টোল প্লাজা দেখেন প্রধানমন্ত্রী।

২৮ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ভোরে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। ডিবির হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয়জন সমন্বয়ক এক ভিডিও বার্তায় সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা বলেছেন। ডিবি কার্যালয়ে ধারণ করা একটি ভিডিও বার্তা রাত ৯টার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

এক ব্রিফিংয়ে সচিবালয়ে বিতর্কিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ডিবির হেফাজতে নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। রাত ৯টার দিকে নাহিদ ইসলামসহ ছয় সমন্বয়কের ওই ভিডিও বার্তা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৃথক বার্তায় এসব কথা বলেন এই আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক মাহিন সরকার, আব্দুল কাদের ও আব্দুল হান্নান মাসুদ। মাহিন সরকার বলেছেন, ‘অস্ত্রের মুখে ডিবি অফিসে ছয় সমন্বয়কের ভিডিও বিবৃতি নেওয়া হয়েছে। এদিন মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়।

৩০ জুলাই: মঙ্গলবার হত্যার বিচার চেয়ে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মিছিল হয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিবৃতিতে স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙায় অনেকেই। রাঙিয়েছেন অনেকে। এসব ব্যক্তির মধ্যে শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আছেন। অন্যদিকে সরকার-সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম জুড়েছেন। এদিন ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে।

৩১ জুলাই: মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির পর বৃহস্পতিবারের জন্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ। এদিনের কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’।

১ আগস্ট: গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

৩ আগস্ট: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি আদায়ে ঘোষণা করা হয়।

৪ আগস্ট: ঢাকায় লং-মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা | প্রথম আলো
শেখ হাসিনার দেশ থেকে পালায়ন

৫ আগস্ট: সোমবার সকালেও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলে। গুলিতে সেদিনও অনেক শিক্ষার্থী নিহত হন। তবে দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ মাধ্যমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঘোষণা দেন। তখনই রাজধানীর বুকে ছাত্র-জনতার ঢল নামে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া লাখো মানুষের সমাবেশ বেলা আড়াইটার দিকে যাত্রা করে গণভবনের দিকে। এরপর জনগণের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং অন্তবর্তী সরকার গঠনের কথা বলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

সেনাপ্রধানের ভাষণের পরই উচ্ছ্বসিত ছাত্র-জনতার মিছিলে মিছিলে স্লোগান ছিল, ‘কী হয়েছে কী হয়েছে, শেখ হাসিনা পালাইছে’। ৩৬ দিন আগে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার চেয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করল। যার জন্য শেষদিন পর্যন্ত সময়কে ‘৩৬ জুলাই’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছে ছাত্র-জনতা।

৬ আগস্ট: সরকারহীন, পুলিশহীন দেশে অরাজকতা চলতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ চলে। ডাকাত আতঙ্ক ছড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তাব মেনে নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংসদ বিলুপ্ত করা হয়।

 

৭ আগস্ট: পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে বাদ দিয়ে মো. ময়নুল ইসলামকে আইজিপি নিয়োগ। র্যা ব ও ডিএমপি কমিশনারও পরিবর্তন। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন পদত্যাগ করেন। মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার নিয়োগ বাতিল করা হয়।

 

০১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে , ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে, আর ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে নতুন নেতৃত্বের। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ লড়াই ও আত্মত্যাগ গোটা বিশ্বকে চমকে দেয়, বাংলাদেশকে এনে দেয় বর্ষসেরা দেশের স্বীকৃতি। এই বিপ্লবের নেপথ্যে ছিলেন আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, নাহিদ ইসলামের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান। ছাত্রশিবিরের নেপথ্য সমর্থন, প্রবাসী সাংবাদিকদের জনমত গঠন এবং সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

০১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে ,

আন্দোলনের স্ফূলিঙ্গ: শহীদ আবু সাঈদ

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয় মূলত রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৬ জুলাই আন্দোলনে দুই হাত প্রসারিত করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে বুক পেতে দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী। পুলিশের ছোড়া বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রোহের আগুন হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বলিষ্ঠ নেতৃত্ব: নাহিদ ইসলাম

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম। আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতন করে। ৩ আগস্ট তিনিই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান নাহিদ ইসলাম।

ছাত্রদের নতুন দল গঠনে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সঙ্গে সংলাপ চলছে

মাত্র ২৬ বছর বয়সেই বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের ‘টাইম-১০০ নেক্সট’- ২০২৪-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

আন্দোলনে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে নেতৃত্ব দেন আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহ, সাজিস আলম, উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুম, আবু বাকের মজুমদার, আবদুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ এবং মাহিন সরকারসহ অনেকে।

তবে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নিয়ে যখন ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনের প্রত্যাহার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন আব্দুল হান্নান মাসউদ, আব্দুল কাদির, রিফাত রশীদ ও মাহিন সরকার।

০১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে ,

নেপথ্যের শক্তি: ছাত্রশিবির

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু থেকেই ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা দল-মত ভেদাভেদ ভুলে অংশ নিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী ও নানা শ্রেণি-পেশা মানুষদের সম্মিলনেই একটি সফল গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সমন্বয়করা ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্র সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করেন।

তবে প্রথম সারির ছয় সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর আন্দোলন যখন বেহাত হয়ে যাচ্ছিল, তখন নেপথের শক্তি হিসেবে আন্দোলনে রসদ জোগায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির। বিশেষ করে ডিবি কার্যালয়ে ছয় সমন্বয়ককে জোর করে যখন আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন ৯ দফা প্রণয়ন করে বাহিরে থাকা সমন্বয়কদের দিয়ে ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে ছাত্রশিবির। এই সমন্বয়কদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকারও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদ তাদের সাবেক কয়েকজন দায়িত্বশীলদের নিয়ে এই ৯ দফা প্রস্তুত করেন। ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউটের সময় সাদিক কায়েম ও ফরহাদরাই নয় দফা সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেন। এই নয় দফাই পরবর্তীতে সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয়। ৯ দফা যে শিবিরই প্রণয়ন করেছিল, তা সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্পষ্ট করেছেন।

এ ছাড়া ‘মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে অনলাইনে প্রচার’ , ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’, গায়েবানা জানাজা, ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ইত্যাদি অভিনব কর্মসূচি প্রণয়নে শিবির ভূমিকা রাখেন বলে সাদিক কায়েম দাবি করেন। যদিও এ বিষয়ে সমন্বয়করা কোনো প্রত্যুত্তর দেননি।

ঢাকা, ৫ জুলাই, ২০২৫ (বাসস):

সাদিক কায়েম জুলাই অভ্যুত্থানকালীন পেছনে থেকে বেশ কয়েকজন সমন্বয়ককে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেন, যাদেরকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এছাড়াও আন্দোলন চলাকালে প্রতিরোধ গড়ে তোলা থেকে শুরু করে ইন্টারনেটবিহীন সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছে দেয়ার কাজও করেছেন তিনি। বাসসের বিশেষ সাক্ষাৎকারে সাদিক কায়েম জানিয়েছেন সেসময়ের দিনগুলোর কথা।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) : তার মানে জুলাই অভ্যুত্থানের অনেক আগেই আপনারা আসলে একসাথে একটা ঐক্য তৈরি করে নিয়েছিলেন?

সাদিক কায়েম : অবশ্যই। যেহেতু আমি শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম, তাই আমি ইচ্ছা করেই সামনে আসতাম না। কারণ এতে যদি অন্যরা বিপদে পড়ে। খুনি হাসিনা তো, শিবির সন্দেহেই পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলাকে জায়েজ করে দিয়েছিল। আমি যেহেতু ছোটবেলাতেই আমার রুমমেটকে খুন হওয়ার স্মৃতি নিয়ে বড় হয়েছি, তাই আমি চাচ্ছিলাম আর কেউ যেন এই বিপদে না পড়ে।

কিন্তু সামনে না এলেও সবসময় পেছন থেকে লজিস্টিক সাপোর্ট বা ম্যানপাওয়ার এসব কিছুতে আমি ছিলাম। আমরা আসলে সব আন্দোলনেই আজাদি খুঁজতেছিলাম। একটা শুধু মোমেন্টামের অপেক্ষায় ছিলাম, যার মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটবে।

বাসস : সেই মোমেন্টামটা জুলাই আন্দোলনে পেলেন?

সাদিক কায়েম : তা পেয়েছিলাম বটে, তবে এতটা সহজেও পাইনি। জুলাই আন্দোলনটার যে রূপান্তর, প্রথমে একটা কোটা সংস্কার আন্দোলন, রায় দিয়ে দেয়ার পর বিচারের দাবিতে আন্দোলন, তারপর সেটা স্বৈরাচারের পতনের দাবিতে এক দফায় নিয়ে যাওয়া এটা বেশ বড়সড় একটা ঘটনা। যদিও ঘটনাগুলো মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঘটেছিল।

বাসস : সংক্ষেপে হলেও শুরু থেকে একটু বলুন, কীভাবে আন্দোলনে আপনি পেছন থেকে নেতৃত্ব দিলেন।

সাদিক কায়েম : জুন মাসে আন্দোলনের ফার্স্ট ফেজ শুরু হয়েছিল। এই আন্দোলনের মাঝে একটা ঈদ হয়। ঈদের পর অনেকেই ভেবেছিল আন্দোলনটা আর দাঁড়াবে না। কিন্তু আমরা সেকেন্ড ফেজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঈদের পর যখন সেকেন্ড ফেজে আন্দোলন শুরু হলো, তখন একটা জিনিস যোগ হলো, যেটা আন্দোলনের শুরুতে ওতটা ছিল না। সেটা হলো- ছাত্রলীগের হামলা আর নির্যাতন।

এই ফেজটা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। কারণ বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরাই হলে থাকে, হলের শিক্ষার্থীদের নিয়েই মূল আন্দোলনটা চালিয়ে নেয়া হচ্ছিল। যদি হলের ছাত্রছাত্রীদের উপর ছাত্রলীগ নির্যাতন করে, তাহলে ভয় পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা আর বের হবে না। আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। এই কঠিন সময়টা যখন পার করছি তখন আমাদের ধারণাও ছিল না, থার্ড ফেজে সরকার কী করতে চলেছে। এতগুলো মানুষকে অবলীলায় খুন করা হবে এইটা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।

বাসস: জুলাই অভ্যুত্থানে সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়টা ছিল ভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষের ঐক্য। আপনি একইসাথে এই ঐক্যের সাথে থাকা ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে থেকেছেন। এই বিষয়টাকে ডিল করেছেন কীভাবে?

সাদিক কায়েম : আপনি যেটা বলেছেন, এটা ঠিক। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির কারণে বড় একটা গোষ্ঠীকে আমার ডিল করতে হতো। আবার জুলাই আন্দোলনের অনেকেই ছিলেন যাদের সাথে আমার মত ও আদর্শের মিল নেই। আমি আসলে দুইটাকে ডিল করেছি স্ব স্ব উপায়ে। কিন্তু যেকোনো মূল্যে আমার আসলে দুই জায়গায় ঠিক থাকা দরকার ছিল।

শিবিরের সর্বোচ্চ বডিকে বলা হয় কার্যকরী পরিষদ। জুলাই মাসের ৩ তারিখ শিবিরের কার্যকরী পরিষদের মিটিং ছিল। ওখানে আমি আধ ঘণ্টা বক্তব্য রেখেছিলাম, এখনও ডকুমেন্ট খুঁজলে আমার কথাগুলো পাওয়া যাবে। সেখানে আমি বলেছিলাম, এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত মানুষদের আদর্শের সাথে মিল থাকুক না থাকুক, ছাত্র শিবিরের অবশ্যই এই আন্দোলনকে সমর্থন করতে হবে। আমাদের পক্ষে যা যা সম্ভব, যেভাবে সাহায্য করা সম্ভব, আমরা যেন করি। এই আহবানে সেই মিটিংয়ে সবাই সাড়া দিয়েছিল।

অপরদিকে আন্দোলন চলাকালে যখনই প্রতিরোধের দরকার হয়েছে, পেছন থেকে আমি সংগঠনের মাধ্যমে সাপোর্ট দিয়েছি। বিশেষ করে আপনাকে একটা ঘটনা বলি। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করল, সেদিন রাতে হলগুলোতে দুইটা প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছিল। একটা হলো, সবাই আতঙ্কে ছিল। এইরকম অমানবিকভাবে মেয়েদের মারতে পারে। আবার অন্যদিকে আমাদের মধ্যে ক্ষোভ ফেটে পড়ছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের এভাবে মারছে, আমরা কি বইসা থাকব নাকি?

তবে ১৫ জুলাই হামলা করার পরই আমরা দ্রুত আহতদের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করি। আমাদের সংগঠনের মেডিকেল টিমের যারা ছিল, তারা দ্রুত আহতদের ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। আর যারা সিভিয়ার ইনজুরড ছিল, তাদেরকে প্রাইভেট হসপিটালে নিয়ে আসা হয়।

সেদিন সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শিবিরের সাথে বসে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেই। সেসময় আসিফ (অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা) আমাকে কল দেয়, আমি জানাই যে, আমরা কালকে যেকোনো মূল্যে চাঁনখারপুল থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। বিশেষ করে সায়েন্সের যে তিনটা হল, আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাদের সাথে নিয়ে কাল ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করব।

পরের দিন ছাত্রলীগ রাজু ভাস্কর্যে প্রোগ্রাম ডাকছিল, আমরা জানতাম বহিরাগতদের এনে তারা রাজু ভাস্কর্য দখল করবে। আগের দিন তারা হামলা করছে, পরের দিন রাজু ভাস্কর্যে প্রোগ্রাম করবে এমন সময়ে আমাদের বের হওয়াটা অনেক রিস্কি ছিল। কিন্তু রাতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে কাল আমরা প্রোগ্রাম করব, আর সেই প্রোগ্রামে যদি আমাদের উপর আক্রমণ হয় আমরা প্রতিরোধ করব। আমি আসিফ (অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা) ও নাহিদকে (জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক) বিষয়টা জানালাম। অনেক জায়গা থেকেই এই কথা আসতে লাগল যে, পোলাপান আতঙ্কে আছে, নাও আসতে পারে। আমি বললাম, পোলাপান থাকবে ইনশাআল্লাহ, সাথে সাথে প্রতিরোধ সামগ্রীও থাকবে। তুমি আল্লাহর নাম বলে প্রোগ্রাম ডাকো।

পরেরদিন দেখলাম শাহবাগ পুলিশ দখল করে রাখছে, রাজু ভাস্কর্য ছাত্রলীগ আরও সন্ত্রাসীদের নিয়ে দখল করে রাখছে। আমি আমার সংগঠনের ছেলেপেলে দিয়ে প্রতিরোধ সামগ্রী ঢোকালাম। তবে আরেকটা কৌশল কাজে লাগালাম, সায়েন্স ল্যাবের দিকে ছেলেপেলে রেডি ছিল। ওখানে একটা সংঘর্ষ বাধলে ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ ওদিকে মুভ করার চান্স ছিল, আমরা সেই সুযোগে প্রতিরোধ সামগ্রী ঢুকিয়ে দিতাম ক্যাম্পাসে। কারণ শহীদ মিনারে আমাদের পোলাপান নিরস্ত্র, ছাত্রলীগ হামলা করলে ওরা পারতো না। আমাদের কৌশল কাজে লাগলো, সায়েন্স ল্যাবে পুলিশকে ব্যাস্ত রেখে আমরা প্রতিরোধ সামগ্রী ক্যাম্পাসে ঢুকিয়ে ফেললাম।

আমাদের হিসেব ছিল বরাবর, আজ যদি আক্রমণ করতে আসে, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের অস্তিত্ব রাখব না।

দুর্দিনের কান্ডারি: প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব)

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর ঢাকায় আন্দোলন যখন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল, তখন আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হলো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব)। এই প্ল্যাটফর্মের ডাকে দুর্দিনে রাস্তায় নামেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যখন রাস্তায় নামলে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন তারা। আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আহত ও নিহত হন।

জনমত গঠনে একদল প্রবাসী সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে জনমত গঠনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকসহ একদল প্রবাসী কনটেন্ট ক্রিয়েটর বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী কয়েকজন সম্পাদক নিজেদের মিডিয়াতে স্বচ্ছ সংবাদ পরিবেশন করে বিশ্বের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরেন। কয়কেজন মিডিয়া কর্মীদের সহায়তায় পুরো আন্দোলনের খবর পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ক্ষোভ ও ত্যাগ

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় প্রবাসীরাও ফুঁসে ওঠেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন তারা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে অনেক প্রবাসী গ্রেপ্তার হন। তবুও থেমে থাকেননি প্রবাসীরা। অনলাইনে প্রচারণার পাশাপাশি রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে পরোক্ষভাবে আন্দোলনে অংশ নেন তারা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রদলের সমর্থন (যুগান্তর প্রতিবেদন প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৪ )

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। নেতাদের দাবি, শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছে। চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অতি সীমিত সংখ্যা কোটা ছাড়া বাংলাদেশে এখন আর কোনো কোটার প্রয়োজন নেই।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সংগঠনটির অবস্থান জানান।

কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে নাছির বলেন, আমাদের অফিশিয়াল বক্তব্য হচ্ছে- চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অতি সীমিত সংখ্যক কোটা ছাড়া বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনো কোটার কোনো প্রয়োজন নেই। চলমান যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীরা করছে, এই আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্রদল পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করছে। আমরা বিশ্বাস করি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীদের রুখে দিয়ে এই আন্দোলন সফল হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

সোমবার সংস্থাটির সাউথ এশিয়া বিষয়ক ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে একটি পোস্ট করা হয়। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আহতদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদান জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।

কোটা সংস্কারে নিয়ে অ্যামনেস্টির বিবৃতি

মনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি