• ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ১২ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

usbnews
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন একই বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নিকট অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন তিনি।
প্রক্টরের নিকট অভিযোগপত্রে ওই নারী লিখেছেন, অধ্যাপক নাদির জুনাইদ কর্তৃক যৌন হয়রানির কারণে বিগত দেড় বছর প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন তিনি। একপর্যায়ে ঘুমের ওষুধ নিতে হয়েছে তার। গত বছরের শুরুতে কাউন্সিলিংও করেছেন তিনি। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অধ্যাপক নাদির জুনাইদ বিভিন্ন সময়ে কথাবার্তায় তাকে যৌন ইঙ্গিত দিতেন এবং প্ররোচিত করতে চেষ্টা করতেন। যৌন প্ররোচনায় সাড়া না দিলে শিক্ষার্থীকে ‘অনুভূতিহীন’, ‘নির্বোধ’, ‘ডাক্তার দেখানো উচিত’ প্রভৃতি মন্তব্য করতেন।

ওই শিক্ষার্থী বলেন, অধ্যাপক নাদির জুনাইদ বিয়ের প্রসঙ্গে কথা বলেন এবং স্পষ্টভাবে আমার দিকে ইঙ্গিত করেন। আমি খুব অবাক হই এবং খুব অস্বস্তিতে পড়ি। তবে, আমি কৌশলে তাকে নাকচ করে দিই।

তিনি আরও জানান, নাদির জুনাইদ ঘন ঘন দেখা করতে বলতেন এবং তার বাসায় আমন্ত্রণ জানাতেন। আমি প্রতিবারই বিভিন্ন অযুহাতে নাকচ করতাম।

অধ্যাপক নাদির জুনাইদের ‘ব্যক্তি-আক্রোশের’ শিকার হওয়ার ভয়ে গত দেড় বছর যাবৎ মুখ বুজে সব সহ্য করেছি।

অধ্যাপক নাদির জুনাইদ অনান্য নারী শিক্ষার্থীর শরীরের অবয়ব নিয়ে নোংরা মন্তব্য করতেন উল্লেখ করে ওই শিক্ষার্থী অভিযোগপত্রে লিখেছেন, নাদির জুনাইদ পরিচয়ের শুরুতে উনার সুন্দর আচরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করেন।

আদর্শের ভেক ধরে থাকেন। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে নারী শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আমার সাথে কথোপকথনের সময়ও উনি বিভিন্ন নারী শিক্ষার্থীদের নাম উল্লেখ করতেন। এমনকি বিভিন্ন সময় তাদের শারীরিক অবয়ব নিয়েও নোংরা মন্তব্য করেছেন। আমার মত অনেক শিক্ষার্থীকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন বিভিন্ন সময় জানতে পেরেছি।

mzamin

সাংবাদিকতা  বিভাগের এই অধ্যাপক বিভাগে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেছেন, আমরা নিজ বিভাগে ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠছি, নিজেদের মধ্যে সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করছি। একজন শিক্ষকের কাছে সবাই কোণঠাসা হয়ে পড়লাম। যেখানে উনি উনার মতো একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন, আর সামনে করতে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, অভিযোগপত্রটি হাতে এসেছে। এটি উপাচার্যের স্যারের অফিসে রাখা হয়েছে। উপাচার্য স্যার টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছেন। স্যার ঢাকায় ফেরার পর তার কাছে অভিযোগ পত্রটি জমা দেয়া হবে। উপাচার্য স্যারই এবিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন বিভাগের একজন ছাত্রী। গতকাল শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. মাকসুদুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্তি হিসেবে শিক্ষকের সঙ্গে তার কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ রেকর্ড এবং বার্তা আদান-প্রদানের স্ক্রিনশটও দেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত আক্রোশে একটি ব্যাচের ফলাফলে ধস নামানোর অভিযোগও আছে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতি ক্লাসেই তিনি (শিক্ষক নাদির জুনাইদ) অ্যাসাইনমেন্টের টপিক নির্ধারণ করতে বলতেন এবং টপিক অনুমোদনের জন্য তাকে সরাসরি ফোন দিতে বলতেন। এই সুবাদে আমি টপিক নির্ধারণের জন্য ফোন দিলে তিনি রাতে কল ব্যাক করতেন এবং ন্যূনতম এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি টপিকের বাইরে গিয়েও ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহ সহকারে কথা বলেছেন। তিনি সব সময় জিজ্ঞেস করতেন তাকে আমার কেমন লাগে ইত্যাদি। একপর্যায়ে তিনি তার বিয়ের প্রসঙ্গে কথা বলেন এবং স্পষ্টভাবে আমার দিকে ইঙ্গিত করেন। আমি খুব অবাক হই এবং খুব অস্বস্তিতে পড়ি। তবে, আমি কৌশলে তাকে নাকচ করে দিই। এরপর তিনি আমাকে নিজে থেকে বলেন, “আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে”। এ ছাড়া তিনি আমার শারীরিক অবয়ব সম্পর্কে নোংরা মন্তব্য করতেন এবং যৌন উত্তেজনা প্রকাশ করতেন।’

অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘তিনি (শিক্ষক নাদির জুনাইদ) আমার সঙ্গে এমন কথাবার্তা বলতেন, যার বেশিরভাগ কথাই সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়ে থাকে। এ ধরনের কথাগুলো ছিল আমার জন্য তীব্র যন্ত্রণার। আমি কত রাত ঘুমাতে পারিনি, কত দিন এই অস্বস্তি এবং মানসিক কষ্ট নিয়ে রাত-দিন পার করেছি কেউ জানে না। তিনি সাধারণত ১০-১১টার মধ্যে কল দিতেন। কিন্তু যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুরু করলে গভীর রাত পর্যন্ত কথা বলতে চাইতেন।’

শিক্ষক নাদির জুনাইদ তার জন্মদিনে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে বাসায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যান উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তার জন্মদিন উপলক্ষে আমাকে দাওয়াত দেন। তিনি আমাকে বারবার বাসায় যাওয়ার জন্য বলতে থাকেন। আমি বলি, আপনার পরিবার অবগত আছে কি না। তিনি নিশ্চিত করলে জন্মদিনে তার বাসায় যাই। তার বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করি। একপর্যায়ে তিনি ছাদে নিয়ে যান। এ সময় সিঁড়ির কাছে তিনি আমার উচ্চতা পরিমাপের কথা বলে কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করেন। আমি বিগত দেড় বছর প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এ যন্ত্রণার প্রকাশ আমি তার সামনে করতে পারিনি। একপর্যায়ে এ যন্ত্রণার পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। গত বছরের শুরুতে আমি কাউন্সিলিংও করি। ঘুমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ খেতে হতো। তিনি আমাদের বিভাগের সামনে চেয়ারপারসন হচ্ছেন। শুধু এই ভয়ে আমার পরিবারের কাছে দেড় বছর আগে থেকে বলতে হচ্ছে যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করব না। দরকার হলে নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করব।’

অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে নাদির জুনাইদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

 

ঢাবি অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিচারের দাবি ছাত্র ইউনিয়নের

প্রতিবাদ সমাবেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে বিভাগেরই এক নারী শিক্ষার্থী দ্বারা আনীত যৌন হয়রানির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের ভিত্তিতে বিচারের দাবি করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অকার্যকর’ যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলকে পুনরায় সক্রিয় করার আহবান জানান। শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনের সামনের পায়রা চত্বরে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে তারা এ দাবি জানান।

প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবির সহ-সভাপতি মাশফিয়া আক্তার মৌমি বলেন, একজন শিক্ষার্থী এখানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চান্স পাবার পরে হলগুলোতে নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে। এসবের মাঝে তারা একটি সেইফ জোন খুঁজতে থাকেন। আমি মনে করি, একজন শিক্ষার্থীর সেইফ জোন হবার কথা একজন শিক্ষক। কিন্তু একজন শিক্ষক রিসার্চ বাদ দিয়ে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে, শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা বাদ দিয়ে, একটা মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার দিকে ঝুঁকে যান। এত কাজের মাঝে তারা কিভাবে ভাবেন যে তারা একজন ছাত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক করবেন?

তিনি বলেন, এই নাদির জুনাইদ একটা নাম শুধু। এমন ঘটনা আমরা অহরহ দেখতে পাচ্ছি। ঢাবিতেই এমন ঘটনা কম না। বর্তমানে একজন নারী রাস্তায়, ক্যাম্পাসে কিংবা ক্লাসেও নিরাপদ না। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে কিন্তু এসবের কোন সুরুহা হয় না। যা একটি দুটি ঘটনা সামনে আসে কিন্তু তার সমাধান হয় না। প্রশাসন বারবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে৷ তাহলে আমাদের প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রশাসনের কাজ কি?

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবির সাংগঠনিক সম্পাদক অর্নি আঞ্জুম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল রয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক কথা হলো এই সেলটি বর্তমানে অকার্যকর। যার ফলে এতদিনে এই সেলে মাত্র ৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে কিন্তু তার একটিরও কোন সুরাহা হয়নি। আমরা এমন যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল চাই, যেখানে নারীরা সরাসরি গিয়ে অভিযোগ দিতে পারবে এবং শিক্ষকরা দ্রুত বিষয়টির সমাধান করবেন।

তিনি বলেন, আমরা এমন ঘটনার সম্মুখীন হওয়া শিক্ষার্থীদের বলবো, তারা যেনো ঘটনার সাথেসাথেই অভিযোগ জানান এবং প্রতিকারের দাবি করুন। আপনারা যদি প্রতিবাদ না করেন, তাহলে এসব ঘটনার বিচার হয় না, কাউকে শাস্তির আওতায় নিয়েও আসা হয় না। আপনারা যদি শক্ত না হন, প্রতিবাদের কণ্ঠ উঁচু না করেন তাহলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবির একাংশের সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, আজকে নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ সেটা কোন একক ঘটনা নয়। মাঝেমধ্যে বলা হয় এমন ঘটনার জন্য পোশাক দায়ী  কিন্তু আমরা মনে করি, এতে পোশাক দায়ী নয় বরং দায়ী হলো ক্ষমতা। এর আগেও সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ইন্সটিটিউটেও এমন ঘটনা ঘটেছে। যেখানে শিক্ষক দ্বারা নারীকে যৌন হয়রানির করা হয়। কিন্তু সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বড় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ক্ষমতার কারণে এসব যৌন নিপীড়করা বরাবরই পার পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রশাসন যতদিন এভাবে দায়সারা মনোভাব দেখাবে, ততদিন এদেশে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ কমবে না বরং এদেশে ধর্ষক তৈরি হবে। তাই আমরা চাই দ্রুত নাদির জুনাইদের বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক।