জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৪ জুলাই দেশব্যাপী গণমিছিলসহ ৩৬ দিনের কর্মসূচি সফল করতে রাজধানীর মগবাজারে ১১ দলীয় ঐক্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ ১ জুলাই (বুধবার) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক, সাবেক এমপি ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, এনসিপির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরদার, এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সোলায়মান হোসাইন, জাগপার ঢাকা মহানগর সভাপতি জিয়াউল আনোয়ার, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, বিডিপির সাধারণ সম্পাদক নিজামুল হক নাঈম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট হেলাল উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক প্রমুখ।
প্রধান অতিথি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১১ দলের গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, ৩৬ দিনের কর্মসূচির প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৪ জুলাই সারা দেশে গণমিছিল সফল করার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জুলাই চেতনাকে জাগরুক রাখতে ১১ দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে গৃহীত কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
জুলাই ঘিরে ছাত্রদল, জামায়াত ও এনসিপির মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা
আজ (১ জুলাই) থেকে শুরু হয়েছে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাস। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়া সেই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের স্মরণে মাসজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংঘাতের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণে ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বুধবার (১ জুলাই) থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি।
ছাত্রদলের কর্মসূচি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলা এবং জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ১ জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে (৩০ জুন দিবাগত মধ্যরাতে) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আলোয় আলোয় স্মৃতি সমুজ্জ্বল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। এ সময় মোমবাতি প্রজ্বালন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জামায়াতের কর্মসূচি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—২ থেকে ৯ জুলাই রাজধানীতে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া; ১৬ জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকার দুই মহানগরীর উদ্যোগে পৃথক আলোচনা সভা; ১৮ থেকে ৩১ জুলাই সারা দেশে শহীদ, আহত ও পঙ্গু পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া; ১ আগস্ট মহানগর, জেলা ও উপজেলায় গণমিছিল; ২ থেকে ৪ আগস্ট শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ১১ দলের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারা দেশের সমাবেশ ও মিছিলে সমর্থন ও অংশগ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও ছাত্রসংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন ফোরামের কর্মসূচিতেও দলটি অংশ নেবে।
এনসিপির ‘জুলাই জাগরণ’
‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ স্লোগান সামনে রেখে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কবর জিয়ারত এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর সংহতি সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া ২ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত দেশব্যাপী গ্রাফিতি অঙ্কন, দেয়াললিখন, ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শন ও পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা
জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষ উপলক্ষে ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ জুলাই ‘জুলাই জাগরণ ও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ পালন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি, জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আহ্বানসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুনতাছির আহমাদ বলেন, জুলাই কেবল একটি মাসের স্মৃতি নয়; এটি অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক দ্রোহ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চলমান অঙ্গীকার। জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে দ্বিতীয় বর্ষে এ কর্মসূচিগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।
সংগঠনটি ঘোষণা দেয়, আগামী ১৮ জুলাই ‘জুলাই জাগরণ ও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঢাকাসহ দেশের সব ক্যাম্পাস এবং জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।
গণঅভ্যুত্থান স্মরণে জুলাই-আগস্টজুড়ে ছাত্র জমিয়তের ৬ কর্মসূচি ঘোষণা
গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর স্মরণে আগামী জুলাই-আগস্ট মাসব্যাপী দেশজুড়ে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাখাকে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের দপ্তর সম্পাদক জুবায়ের হোসেন স্বাক্ষরিত এক সাংগঠনিক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে দুই মাসব্যাপী এসব কর্মসূচি পালন করা হবে।
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, দেশব্যাপী ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা; সকল ক্যাম্পাসে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ বিষয়ক দেয়ালিকা প্রদর্শনী এবং ‘গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভা; শহীদদের কবর জিয়ারত, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়; ‘ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী’ শীর্ষক গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময়; আগস্ট মাসব্যাপী দেশের সকল জেলা ও মহানগরে ফ্যাসিবাদবিরোধী পদযাত্রা এবং গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় সংগঠনের সব শাখায় পবিত্র কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন।
কর্মসূচি প্রসঙ্গে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সাআদ বিন জাকির কালবেলাকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই স্মরণীয় জুলাই-আগস্ট উপলক্ষে দেশব্যাপী এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, প্রতিটি শাখা কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়াক এবং আলোচনা-সেমিনারের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস ও শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মাঝে পৌঁছে দিক। একই সঙ্গে বৈষম্য, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী গণসচেতনতা তৈরিতেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় শৃঙ্খলা ও মর্যাদার সঙ্গে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রতিটি কর্মসূচির ছবি, ভিডিও ও সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জুলাই শহীদদের স্মরণে ভাসানী জনশক্তি পার্টির মাসব্যাপী কর্মসূচি
জুলাই শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের আত্মত্যাগের গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘ভাসানী জনশক্তি পার্টি’ মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
বুধবার সংগঠনের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ১১টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ। ১৯ জুলাই ‘জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য, শহীদদের অবদান এবং জাতীয় জীবনে তাদের আত্মত্যাগের গুরুত্ব’ তুলে ধরে আলোচনা সভা। ২৪ জুলাই ‘জুলাই শহীদ’দের রুহের মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
দলের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু এবং মহাসচিব ড. আবু ইউসুফ সেলিম গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। তাদের ত্যাগের আদর্শকে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।’
শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শনের জন্য জাতীয় ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমকে আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তারা।