• ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২০শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ শহীদ পরিবারের সদস্যরা : সন্তান-স্বজন হত্যার বিচার চান

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ৪, ২০২৬
‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ শহীদ পরিবারের সদস্যরা : সন্তান-স্বজন হত্যার বিচার চান
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজনরা বলেছেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত না হলে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত অবসান সম্ভব নয়। তারা অভিযোগ করেন, বিচারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। একই সঙ্গে উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার দাবি জানান তারা।

শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ এসব দাবি তুলে ধরেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সম্মেলনে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের স্বজনরা নিজেদের বেদনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পুরো সম্মেলনস্থলজুড়ে ছিল শোক ও দীর্ঘশ্বাসের আবহ।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল–‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই স্মরণ সভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্মৃতিচারণা আর শ্রদ্ধার এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতারা।

সম্মেলনে অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার আত্মত্যাগ সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছিল রাজপথে নামার জন্য। জুলাইয়ে অংশগ্রহণ করা অনেকেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার আর্জি জানাচ্ছি।’ ভাইয়ের হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক সংরক্ষণ করার আর্জি জানাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের শক্তি।’

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তার ছেলে আর ফিরে আসবে না, তবে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাবা-মাকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়। তিনি আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করা জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ সহায়তার আহ্বান জানান।

শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ভাই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন এবং তার অনুপ্রেরণায় আরও অনেকে প্রাণ দিয়েছেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তিনি দ্রুত বিচার, শহীদ পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা এবং সারাদেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানান।

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, বড় ছেলে নিহত হওয়ার পর ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। সে সময় নানা জায়গায় সহযোগিতা চাইলেও সহায়তা পাননি। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও তাদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন। তার প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে সব শহীদ পরিবারও একই ধরনের সহায়তা পাবে এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ৫ আগস্টের অর্জন কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের নয়; এটি জনগণের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করবে এবং আইন অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। তবে বিচারের নামে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

নিহত ১৫ বছর বয়সি আলভীর বাবা আবুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সন্তানের বিচারের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচারের নামে একধরনের প্রতারণা করেছে। এখন আমরা বর্তমান সরকারের কাছে একটি দৃশ্যমান ও সুষ্ঠু বিচারের প্রত্যাশা করছি।’

একইভাবে আক্ষেপ ও বিচারহীনতার শঙ্কা প্রকাশ করেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিক আলম। তিনি বলেন, ‘আদৌ আমরা সন্তানের বিচার পাব কি না, তা জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে চাই, একজন সন্তান হত্যার বিচার হলেও আমরা শান্তি পাব।’

নিহত শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুর রব মিয়া স্মৃতিফলক সুরক্ষার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমার ছেলে তার মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছিল, এটাই তার অপরাধ ছিল। শুধু জুলাই না, শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যারও বিচার করতে হবে। জুলাই শহীদদের কবরের নামফলক তৈরির জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই স্মৃতিফলকগুলো অবহেলায় রয়েছে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেখানে জুলাই শহীদদের নাম লেখা থাকে, তার সম্মান যেন বজায় থাকে।’

স্মরণ সভায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ আবদুল্লাহ জামিলের মা ফাতেমা তুজ জোহরা বিগত দিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ৫ আগস্ট শহীদ হয়। এরপর আমার ১৩ বছরের ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং আমার স্বামীও মারা যান। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে যথাযথ সাহায্য পাই নাই। যাদের ডাকে আমরা সাড়া দিয়েছিলাম, তারা কেউ আমাদের কাছে আসে নাই। তবে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও তারেক রহমান সবসময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

অনুষ্ঠানে আহত যোদ্ধারাও নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। আহত শাহীন মালু বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুইভাবে আমাদের দেখেছে। তবে দেশ নিরাপদ থাকবে বিএনপির হাতে।’

অন্যদিকে ছাত্রদল কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত আমরা বিএনপি কর্মীরা কেউ পরিপূর্ণ চিকিৎসা পাইনি। আমরা ছাত্রদলের কর্মী হওয়ায় ভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের কারণে আমাদের গেজেটে নাম ওঠানো বা মূল্যায়ন করা হয়নি।’

অনুষ্ঠানে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টেনে স্মরণ করা হয়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন শেষমেশ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী সরকার উৎখাতের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে পুরো দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলন দমাতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গুলি, টিয়ারশেল ও চরম বলপ্রয়োগ করা হয়। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রথমে ফেসবুক এবং পরে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হলেও তা হিতে বিপরীত হয়।

১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর এই আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত রক্তপাত শুরু হওয়ার ২০ দিনের মাথায় পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের যে তালিকা সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, সেখানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে।