২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের দমাতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছিলো বলে প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ দিয়ে দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিলো, তার সমস্ত অপকর্ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে দল নিষিদ্ধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি বিধান রয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নানা সময়ে আওয়ামী লীগ ব্যক্তি ও দলগতভাবে গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িয়েছে। সরকারের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেও তারা মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। জুলাই বিপ্লবের সময় নৃশংস কায়দায় আন্দোলন দমনে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, এই অপরাধযজ্ঞে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্য কোনো দলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের আহবান জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা দেশে এসে নিজের বিচারের মুখোমুখি নিজে হোন, সেটাই আমরা চাই। তিনি আদালতে এসে তার সাজা চ্যালেঞ্জ করুন।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর জানান, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হলেই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দল নিষিদ্ধ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরুর নজির তৈরি হতে যাচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, দলের বিচার ও দল নিষিদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া, সে আইনগুলো আওয়ামী লীগই প্রণয়ন করেছে। সংবিধান সংযোজন করেছে। আওয়ামী লীগ ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসন কায়েমের জন্য সার্বিক সহযোগিতা করেছে। তখন গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছিল। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করাসহ সবকিছুতেই আওয়ামী লীগ দোসর হিসেবে কাজ করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে লগি-বইঠা ব্যবহার করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। তখন দল হিসেবে এই সংগঠন নির্বিচারে মানুষের জানমাল হরণ করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, একইভাবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে ফ্যাসিজম কায়েম করেছিল। সেই ফ্যাসিজমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছু আওয়ামী লীগ কেড়ে নিয়েছিল।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে গিয়ে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। গত ১৬ বছর মানুষের কোনো স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না। যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি রাতে, কোনোটি একদলীয়, কোনোটি আমি-ডামির নির্বাচন ছিল। তারা সরকারে থেকে নানা বাহিনী দিয়ে মানুষের জানমালের ক্ষতি করেছে। জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর বিভিন্ন বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মূল দল জনগণের জানমালের ওপর আক্রমণ করে হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নানা অপরাধ সংঘটন করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন আওয়ামী লীগ প্রণয়ন করেছিল। এই দুটি আইনেই তাদের বিচারের ব্যবস্থা আছে। ট্রাইব্যুনালে একটি লিখিত অভিযোগ ছিল। তা তদন্ত সংস্থায় পাঠানোর পর তদন্ত চলছে। তদন্তের পরে যদি সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া যায়, তখন প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা থাকলে নিশ্চয়ই সেটা রিপোর্টে আসবে। তখন তাদেরও বিচার করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন, ফিরলে তিনি আপিল করতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘রায় ঘোষণার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিলের বিধান আছে। ইতিমধ্যে তাঁর সে সময়, সেটি পার হয়ে গেছে। এখন তিনি যদি আসেন এবং যদি কোনো আইনগত পদক্ষেপ নিতে চান, তখনকার অবস্থা কী হয়, সেটা তখনই বোঝা যাবে। তবে আমরা চাই, তিনি দেশে আসুন। তাঁর (শেখ হাসিনা) বিরুদ্ধে যে দণ্ড আছে, তিনি সেটা চ্যালেঞ্জ করুক।’