• ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৩শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে ফ্রান্স, নিরাপদ আশ্রয়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ৭, ২০২৬
ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে ফ্রান্স, নিরাপদ আশ্রয়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল দ্রুত বিস্তার লাভ করায় জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়া এবং প্রবল বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরবাড়ি ছেড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে শত শত দমকলকর্মী, বিশেষায়িত অগ্নিনির্বাপণ যান, হেলিকপ্টার ও পানি নিক্ষেপকারী বিমান মোতায়েন করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।

ফরাসি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের পিরেনিজ-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুন অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করেছে। তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় দমকল বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দাবানলের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক পরিবারকে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

আগুন নেভাতে দিন-রাত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে আকাশপথে পানি ছিটিয়ে আগুনের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। অভিযানের সময় কয়েকজন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের অবস্থা গুরুতর নয়।

ফ্রান্সের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপপ্রবাহ আরও কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে। কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও কম আর্দ্রতার কারণে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

চরম গরমে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন পর্যটক, কৃষক এবং খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান, রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দাবানলের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাইক্লিং প্রতিযোগিতা Tour de France-এর ওপরও। আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় কয়েকটি রুটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কিছু স্থানে দর্শকদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতার আয়োজকরা জানিয়েছেন, তীব্র গরমে অংশগ্রহণকারী সাইক্লিস্টদের জন্য অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি, বরফ, মেডিকেল সহায়তা এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিযোগিতার কিছু রুট পরিবর্তনেরও প্রস্তুতি রয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাবানলের ঘটনাও। দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং শুষ্ক উদ্ভিদ আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্সের চলমান এই দাবানল কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বাস্তব চিত্র। এর প্রভাব শুধু বন ও পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনেও পড়ছে।

দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে দাবানল এখন প্রতি গ্রীষ্মের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হতে হবে।