বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে প্রায় ২৫ বছর চাকরি করার অভিযোগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামকে অন্য দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে জাল সনদ, দুর্নীতি ও সরকারি সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও কেবল বদলির সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আজ বুধবার বেবিচকের প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তিরান হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জানানো হয়, সিভিল সার্কেল প্রকল্পে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামকে পিডিকিউ অ্যান্ড কিউএস সার্কেলে পদায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে ওই সার্কেলে সংযুক্ত রেখে পরিচালক (এরোড্রাম স্ট্যান্ডার্ড), এফএস অ্যান্ড আর বিভাগে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত জুনে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০০১ সালে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে বেবিচকে নিয়োগ পান শরিফুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি মুক্তিযোদ্ধা গেজেট ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা ডেটাবেইসে তাঁর বাবার নাম নেই। পরে তাঁর চাকরি-সংক্রান্ত নথিপত্রে চারটি পৃথক মুক্তিযোদ্ধা সনদের তথ্য পাওয়া যায়।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি, ত্রিমুখী তদন্তের মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি, ত্রিমুখী তদন্তের মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম
অভিযোগ অনুযায়ী, চারটি সনদে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ, আলাদা স্মারক নম্বর এবং বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে। কোনো সনদে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর, কোনো সনদে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের, কোনো সনদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবং অন্য একটি সনদে সেক্টর কমান্ডার আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ সরকারি গেজেট ও জাতীয় ডেটাবেইসে তাঁর বাবার নাম না থাকায় এসব সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়।
জাল সনদের অভিযোগের পাশাপাশি শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেবিচকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, কাওলা আবাসিক কোয়ার্টার রক্ষণাবেক্ষণে অর্থ আত্মসাৎ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত ও মামলা চলছে।
এসব অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় তাঁকে কেবল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। বদলির আদেশে অভিযোগ বা চলমান তদন্তের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কি শুধুই বদলিতে সীমাবদ্ধ থাকবে; নাকি তদন্ত শেষ হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এ বিষয়ে বেবিচক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি বা সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতির অভিযোগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. শরিফুল ইসলাম এখন ত্রিমুখী তদন্তের মুখে পড়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বেবিচক, গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শরিফুল ইসলামের চাকরির সময় জমা দেওয়া তাঁর বাবা মো. মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাই প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানেই একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও তাঁর বাবার নাম পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, ‘অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মো. শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বেবিচকে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সদর দপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর বাবা মো. মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। তবে সংশ্লিষ্ট সনদের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, শরিফুল ইসলামের জমা দেওয়া ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যু করা একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ফলে সনদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা নথিপত্র যাচাই-বাছাই করছি। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত এগোচ্ছে। শিগগির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
শুধু চাকরি নয়, পদোন্নতি নিয়েও শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলারও আসামি তিনি। অভিযোগ রয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তিনি পদোন্নতি পান। নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেবিচকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে শরিফুল ইসলামের নামও উঠে আসে। পরে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলেও জানা গেছে।
এদিকে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া ও ফাইল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গেলে ফাইল এগোতে টাকা লাগে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়। ঠিকাদারদের কাছে তিনি আতঙ্কের নাম।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।