• ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৩শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে বৈধতা দিল ন্যাটো , ত্রিপক্ষীয় জোটের পথে যুক্তরাষ্ট্র

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ৮, ২০২৬
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে বৈধতা দিল ন্যাটো , ত্রিপক্ষীয় জোটের পথে যুক্তরাষ্ট্র
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ আগ্রাসনকে বৈধতা দিয়েছেন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট। তিনি বলেন, ‘ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলাগুলো খুব দরকার ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখানোটা অত্যন্ত জরুরি।’

বুধবার তুরস্কের রাজধানী আংকারায় শুরু হওয়া ৩৬তম ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন জোট সংগঠনটির প্রধান কর্মকর্তারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তেহরানের তেল বিক্রির বিশেষ লাইসেন্সও বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন এই পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের মধ্যকার আগে থেকেই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

আংকারায় সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকে এবং ইরান মূলত সেটি লঙ্ঘন করে, তখন আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখানোটা অত্যন্ত জরুরি ছিল।’

আংকারা শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সামরিক জোটে পুনরায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে রাজি করানো। কারণ, ইরান যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সম্প্রতি ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। অবশ্য রুটো জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অঙ্গীকার’ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। তার মতে, এই জোট মূলত যুক্তরাষ্ট্রকেও রক্ষা করতে কাজ করে।

ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বণ্টন নিয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে রুট আরও বলেন, ‘তবে এই প্রত্যাশাও রয়েছে যে ইউরোপীয় ও কানাডিয়ানরা প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সমপরিমাণ ব্যয় করবে, যা আমি মনে করি সম্পূর্ণ ন্যায্য।’

ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক বাজেট বাড়ানোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি একে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। রুটে বলেন, ‘সুখবর হলো, এটাই আজকের বড় জয়। এটি ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি ক্ষতি, আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় জয় যে ইউরোপীয় ও কানাডিয়ানরা অবশেষে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে ঠিক তাই করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরাক ও সিরিয়া। তিনটি সিরীয়, পশ্চিমা ও ইরাকি সূত্র গত সোমবার লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আশারক আল–আওসাতকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক জোটের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আঞ্চলিক শিবির থেকে দেশ দুটির সরে আসার ইঙ্গিত বহন করছে।

সিরীয় সূত্র জানিয়েছে, সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি অথবা তার সফরসঙ্গী ইরাকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফাঁকে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

পশ্চিমা একটি সূত্রের ভাষ্য, এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে হোয়াইট হাউসে আল-জাইদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশিত বৈঠকের পর। সিরীয় সূত্রটি আরও জানায়, বাগদাদ ও দামেস্কের মধ্যকার এই চুক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করবেন সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক। চলমান কারিগরি ও রাজনৈতিক সমঝোতা চূড়ান্ত হলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য আরব দেশও এতে যোগ দিতে পারে।

অন্যদিকে একটি ইরাকি সূত্র আল-জাইদির সঙ্গে সিরীয় কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিতও করেনি, তবে অস্বীকারও করেনি। তবে আগের ইরাকি সরকারের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেছেন, আল-জাইদির দল সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরেকটি ইরাকি সূত্র জানিয়েছে, ১৫ জুলাই শুরু হয়ে প্রায় চার দিনব্যাপী আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস নেতারা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর তিনি টেক্সাস সফর করবেন, যেখানে বড় বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অতিরিক্ত বৈঠক করার কথা রয়েছে।

এক ইরাকি সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকই সফরের প্রধান এজেন্ডা।’ তবে তিনি অন্য কোনো দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরাকি সরকার সমান্তরালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করছে। প্রথমত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে সেগুলোকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, যাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাদের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

একই সময়ে মার্কিন প্রশাসন ইরাকের ওপর ইরানের প্রভাব কমানোর জন্য চাপ অব্যাহত রাখায় বাগদাদও ক্রমশ ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আল-জাইদির সরকার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এটি এমন একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা বাগদাদ, ওয়াশিংটন ও তেহরানের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।

ইরাক বর্তমানে তেল রপ্তানির পথ বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি প্রচলিত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সিরিয়া নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যের আঞ্চলিক করিডর হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা করছে।

পশ্চিমা সূত্রটি জানিয়েছে, সিরিয়ায় মার্কিন দূত টম বারাক ইরাক ও সিরিয়াকে ঘিরে তার কৌশলকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে কাজ করছেন। তার লক্ষ্য হলো ইরাক, সিরিয়া এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের স্বার্থকে একত্র করে একটি ‘নতুন স্বার্থভিত্তিক জোটের মূল ভিত্তি’ গড়ে তোলা। এই জোটের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর একটি সংক্ষিপ্ত রুট তৈরি হবে, যা হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাবে।

প্রস্তাবিত রূপে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে এটি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিফলন হবে। এতে ইরাককে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সঙ্গে সংযুক্তকারী আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক জ্বালানি প্রবাহ পুনর্গঠনে সিরিয়াকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া হবে।