টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের জনজীবন। এই দুর্যোগে পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামে এসেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ সংবাদ
সকাল আটটায় আকাশপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছান তিনি। এরপরই সরাসরি বাঁশখালী উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে, মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ।

বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই কঠিন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে দুর্গতদের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছি।’
তিনি বলেন, আমি এখানে রাজনীতি করতে আসিনি। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা শুনতেই এসেছি।


পরিদর্শন শেষে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
সফরসূচি অনুযায়ী, বিরোধীদলীয় নেতা আজ বাঁশখালীর পাশাপাশি সাতকানিয়া ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন এবং সেখানকার মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করবেন।
এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার আমীর আনোয়ারুল আলম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, টানা কয়েকদিনের অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। অসংখ্য পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অথবা পানিবন্দি অবস্থায় চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
চলছে পাহাড়ে-সমতলে টানা অতি বর্ষণ। ফলে কক্সবাজার জেলার নদীগুলোতে নেমেছে পাহাড়ি ঢল। অবিরাম বর্ষণের পানি দ্রুত নামতে না পারায় জেলা জুড়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা-প্লাবন। ডুবে রয়েছে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। ডুবে রয়েছে অনেক গ্রামীণ গুরুত্বপূর্ণ নানা সড়ক-উপসড়কও। নদীর পানি বেড়ে ভেঙে গেছে অনেক এলাকার বাঁধ। এতে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ডুবে গেছে শত শত পরিবারের রান্না ঘর।
ফলে, চুলা জ্বালানো বন্ধ রয়েছে পানিবন্দী পরিবারগুলোতে। জেলায় কমপক্ষে ৮ লাখ মানুষ জলমগ্নতায় ভুগছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
এদিকে, বিল-ঝিলে ভরে যাওয়া পানি নামতে না পেরে প্লাবিত হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক। সড়কের রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি কাঠিরমাথা, মিঠাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পানেরছড়া, চাইল্যাতলীসহ আরও কয়েক এলাকায় রাস্তা পানির নিচে ডুবে রয়েছে। কয়েকটি জায়গায় দুই ফুটের উপর হয়ে পানি চলাচল করছে। কার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহন চলাচল এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। বাস ও মিনিবাসগুলো কোনভাবে চলাচল করছে।
রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া, ফতেখারকুল, চাকমারকুল, উখিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বুক সমান পানিতে ডুবে আছে। একই অবস্থা ঈদগাঁওর জালালাবাদ, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ভোমরিয়াঘোনা, দরগাহপাড়া, মাইজপাড়ায়। এসব এলাকায় জমা পানি রেলপথের জন্য দ্রুত নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর ফারুক আহমদ বলেন, উন্নত যোগাযোগের জন্য গড়া রেলপথ কক্সবাজারে দুঃখ হিসেবে ধরা দিয়েছে। আগে বিলে জমা পানি সবখান দিয়ে নদীতে পড়তো। কিন্তু রেলপথ করতে গিয়ে খুব কম সংখ্যক কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। তাও অপরিকল্পিত ভাবে হওয়ায় নিচু এলাকার পানি নামতে বাঁধা পায়। ফলে, জমে থাকা পানি সড়কের উপর দিয়ে চলাচল করে। ডুকে যায় মানুষের ভিটা-বাড়িতে। অনেকের রান্নাঘর ডুবে থাকায় অসংখ্য পরিবার চুলা জ্বালাতে পারছে না।
ঈদগাঁও নাসির উদ্দিন বলেন, শুধু রামুতে নয়। রেলপথ জেলার চকরিয়া-ঈদগাঁও-রামু-সদর উপজেলার উপর দিয়ে চলে গেছে। সবখানেই এটি বাঁধের ভূমিকা পালন করছে। পানি চলাচলের কথা চিন্তা করে পরিকল্পিত ভাবে কম দূরত্বে কালভার্ট বসানো দরকার ছিল। কিন্তু না হওয়ায় পানি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির অন্ত নেই।
অপরদিকে, চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চিরিংগা সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ২৯ মিটার। মাতামুহুরীর উজানে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা প্রশাসন জানায়, চকরিয়ার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা, পেকুয়ার ৭ ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা এবং মাতামুহুরীর ৭টি ইউনিয়নে ঢলের পানি প্রবেশ করেছে।চকরিয়ার বরইতলী, ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিল, কাকারা, লক্ষ্যারচর, সুরাজপুর-মানিকপুর, হারবাং, খুটাখালী, চিরিংগা, ডুলাহাজারা এবং পেকুয়ার পৌরসভা, টৈটং, মগনামা, বারবাকিয়া, রাজাখালী, উজানটিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, ভেওলা মানিকচর, পশ্চিম ভেওলা, বদরখালী ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। এতে তিন উপজেলার গ্রামীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। এসব ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সংকটও দেখা দিয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, মাতামুহুরীর নদীর কোনাখালী পুরুইত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। পৌরসভার ভাঙারমুখ, আমাইন্যারচর, নামার চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর পুরুইত্যাখালী, মরংঘোনা এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বাঁধ রয়েছে ঝুঁকিতে।
ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী নদীতেও দুই কূল উপচে ঢল নেমেছে। ঢলে ভেসে আসা লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে সাজেদ (১২) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফুলেশ্বরী নদীর রামুর ঈদগড় পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চরপাড়া নুরানি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
পশ্চিম ভোমরিয়াঘোনা, চৌধুরীপাড়া, উত্তরপাড়া, কানিয়ারছড়াসহ নিম্নাঞ্চল ঢলের পানিতে ডুবে রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এ ভোগান্তি পোহাচ্ছে এলাকার অর্ধ লাখ মানুষ। অনেকের রান্নাও বন্ধ। প্রশাসনিক কোন সহায়তা নেই।
চকরিয়া শান্তিবাজার এলাকার লোকজন বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকাটি পানিবন্দী-প্রশাসন কিংবা অন্য কারো সহযোগিতা আসেনি। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের নারী-শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি।
মাতামুহুরী কোনাখালীর বাসিন্দা হারুন রশিদ বলেন, এ বছর বৃষ্টিতে বিলে যেমন পানি বেড়েছে মাতামুহুরী নদীতেও তেমন পানি বেশি। প্রভাবশালীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
চকরিয়ার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।উপজেলার নতুন কিছু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধসে দুই শিশু নিহত হয়েছে। এরই মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় ২০ টন ও মাতামুহুরীতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, মাতামুহুরীসহ জেলার আরও কয়েক নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি বেড়েই চলেছে।