• ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৫শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড : বন্ধ ২৫ সরকারি পাটকলের ২০টি লিজের জন্য নির্বাচিত

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ১০, ২০২৬
বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড : বন্ধ ২৫ সরকারি পাটকলের ২০টি লিজের জন্য নির্বাচিত
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

বন্ধ কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগের অংশ হিসেবে নরসিংদীর বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড (বিজেএমএল) আরও প্রায় ১৫ একর জমি জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডকে লিজ দিয়েছে সরকার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি এ জমিতে নতুন করে প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুকরণ-সংক্রান্ত লিজ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।

সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডকে লিজ দেওয়ায় কারখানাটিতে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার পাটজাত পণ্য উৎপাদন হবে এবং নতুন করে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সেখানে বর্তমানে দিনে প্রায় ৪০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রায় ৩ হাজার ২০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর আগে কারখানাটির ৭৭ দশমিক ২ একর জমির মধ্যে ৩৪ দশমিক ৫০ একর জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয়েছিল। নতুন করে আরও ১৪ দশমিক ৮০ একর জমি লিজ দেওয়া হলো।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিজেএমসির বন্ধ থাকা মিলগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকা ২৫টি মিলের মধ্যে ২০টিকে লিজ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টির লিজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে এতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৬০ টন পাটজাত পণ্য।

অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক কারখানার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। তাই নতুন বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব স্থানে শিল্পায়ন পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এর দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাবে।’

কী পদ্ধতিতে সরকারি কারখানাগুলোকে লিজ দেওয়া হচ্ছে সে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘সব পাটকলের জন্য একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না। পিপিপির আওতায় দীর্ঘমেয়াদি লিজ, রাজস্ব ভাগাভাগি বা যৌথ মালিকানাসহ উপযুক্ত মডেল আইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।’

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘এটি বিজেএমসির বন্ধ মিল পুনরুজ্জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি মিল বেসরকারি বিনিয়োগের আওতায় আনা হবে।’

চুক্তিতে বিজেএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কবির উদ্দিন সিকদার এবং জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের পক্ষে এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার সই করেন। অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পাট শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যাপী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার ফলে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বাড়ছে বিপুলভাবে। ইউরোপের ২৮টি দেশে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ হচ্ছে। ২০২২ সাল নাগাদ শুধু পাটের ব্যাগের বৈশ্বিক বাজার দাঁড়াবে ২৬০ কোটি ডলারের। পাট থেকে পলিমার ব্যাগ, ঢেউটিন, মিহিসুতা ভিসকস, পাট ও তুলা থেকে তৈরি কাপড় জুটন উৎপাদন সম্ভব। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এরই মধ্যে ২৩৫ ধরনের দৃষ্টিনন্দন বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন করছে। বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল মোটরগাড়ি, জাহাজ ও নির্মাণ শিল্পে পাটের বিশাল সম্ভাবনা আছে। করোনাকালে যেখানে অন্যান্য রপ্তানি পণ্য থেকে আয় কমেছে, সেখানে বিশ্বে চাহিদা বাড়তে থাকায় পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এ বছর জুলাই মাসে পাট খাত থেকে রপ্তানি আয় গত বছরের জুলাই থেকে ৩৮.২৩% বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক বাজারের ১০ শতাংশও দখল করতে পারলে, শুধু এই পাট দিয়েই বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। চাল-গম-আটা-চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়ক ব্যবহারে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ২০১০ সালে প্রণীত আইন বাস্তবায়ন হলে দেশের বাজারেও পাটের বিপুল চাহিদার সৃষ্টি হবে। আমাদের দেশে আছে উৎকৃষ্ট মানের পাটের জাত, উৎপাদনের জন্য উর্বর মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, গত পাঁচ দশকে গড়ে উঠা অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনশক্তি। পাটশিল্পের যন্ত্রপাতি দেশে তৈরি ও মেরামত করা সম্ভব। অর্থাৎ, বিদেশ থেকে কিছুই আমদানি করতে হয় না। যেখানে গার্মেন্টস শিল্পের ৮০% কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ দূষণে ১৮০টা দেশের মধ্যে ১৭৯তম। অন্যান্য শিল্পের তুলনায় পাট শিল্পের পরিবেশ দূষণ প্রায় নেই, বরং পরিবেশ বান্ধব। পাটের সাথে শিল্প ও কৃষি দুটোই যুক্ত। পাটকে কেন্দ্র করে এ দুই খাতেই বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। দেশে কর্মসংস্থান হলে দেশের তরুণ-যুবকদের কাজের সন্ধানে বিদেশ যেতে সাগরে ডুবে, বসনিয়ার জঙ্গলে, থাইল্যান্ডের গণকবরে জীবন দিতে হতো না। ফলে প্রয়োজন, পাটকে কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করে এর বিকাশে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা।

পাটকলে লোকসান কেন

এখন প্রশ্ন, এত বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় পাটকলে কেন লোকসান? বিজেএমসি’র রিপোর্টেই বলা হচ্ছে : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর লোকসানের প্রধান কারণ-সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারা। জুলাই-আগস্ট মাসে যখন কৃষকের হাতে পাট থাকে এবং পাটের দাম ১২০০-১৫০০ টাকা তখন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার পাট কেনার জন্য টাকা বরাদ্দ করা হয় না। আবার যখন পাট চলে যায় আড়তদারের কাছে এবং দাম মণপ্রতি ২২০০-২৫০০ টাকা হয়ে যায়, তখন পাট কেনার টাকা বরাদ্দ হয়। এতে কৃষকের লাভ হয় না মোটেই, কিন্তু কারখানার লোকসান হয় প্রচুর। এর দায় কার, শ্রমিকের না নীতি নির্ধারকদের? আবার প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ না করায় পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায় না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর কোনো আধুনিকায়ন হয়নি। সবগুলো কারখানায় বেশিরভাগ তাঁতই বিকল ও পুরাতন হয়ে পড়ায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ২০১৮-১৯ সালে তাঁত চালু ছিল মাত্র ৩৮%। ফলে চাহিদার অর্ধেকেরও কম কাঁচামাল আর ৩৮% সচল তাঁত দিয়ে উৎপাদন করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো প্রতিযোগিতায় বেসরকারি পাটকল থেকে পিছিয়ে পড়ে। যার ফলে লোকসানের পাল্লা বেড়েছে। উৎপন্ন পাটপণ্যও গুদামে পড়ে থেকে নষ্ট হয়, মার্কেটিং হয় না। এর জন্য কি শ্রমিক দায়ী, নাকি ম্যানেজমেন্ট দায়ী?

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের পেছনে সরকারের বড় অজুহাত লোকসান। কিন্তু কেন লোকসান, কাদের কারণে লোকসান, লোকসান কাটাতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? পাটকলে লোকসানের প্রধান কারণ-১. সময়মত ও চাহিদামত পাট কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া, ২. বেশি দামে নিম্নমানের পাট কেনা, ৩. মাথাভারী প্রশাসনের উচ্চ ব্যয়, ৪. ৫০-এর দশকের পুরনো তাঁত দিয়ে উৎপাদন করা, ৫. বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-মন্ত্রীদের দুর্নীতি-অদক্ষতা-দায়িত্বহীনতা, ৬. উৎপাদিত পণ্য মার্কেটিং করতে না পারা, ৭. রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে লোকসান দেখিয়ে বেসরকারিকরণের সরকারি নীতি। লোকসানের জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কারও কি আজ পর্যন্ত কোনো শাস্তি হয়েছে? লোকসানের কারণ দূর না করে জনগণের সম্পদ লুটপাটের আয়োজন করা হচ্ছে ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে।

পাটকল বন্ধ ছাড়া কি উপায় ছিল না?

২০১৬ সালে চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাট সংস্থা বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে সরেজমিনে পাটকলগুলো পরিদর্শন করে। তারা সুপারিশ করে মাত্র ২৬৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সম্পূর্ণ আধুনিকীকরণ করা যাবে। কিন্তু সরকার চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্মতিপত্র চুক্তিতে স্বাক্ষর করে পরে তা থেকে সরে আসে। আধুনিকায়নের জন্য সে বরাদ্দও আর করেনি। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ হিসেব করে দেখিয়েছিলেন, ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক তাঁত স্থাপন করলে উৎপাদন বাড়বে তিনগুণ, শ্রমিকদের গড়ে ২৫ হাজার টাকা বেতন দিয়েও পাটকল লাভজনক করা সম্ভব।

সরকার বলে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ৪৪ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, জনগণের টাকা এভাবে লোকসান কেন দেব? এভাবে দেখলে বিমান, রেল, বিআরটিসি, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ইত্যাদি অনেক খাত থেকে সরকারের লাভ হয় না, ভর্তুকি দিতে হয়। তাহলে কি এসব বন্ধ করে দিতে হবে? এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্যমতে অনেকগুলো কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কোনো উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও, সরকার মাত্র ৬ বছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে। সেগুলো তো বন্ধ করা হয়নি? লোকসানের কথা বলে ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে গার্মেণ্টস মালিকদের হাজার হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়া হয়। এ টাকা কি জনগণের নয়? লোকসানের কথা বলা হয়, কিন্তু পাটকলগুলো ৪৪ বছরে সরকারকে কি পরিমাণ ট্যাক্স, বিদ্যুৎবিল, পানির বিল ইত্যাদি দিয়েছে-সে হিসেব দেওয়া হয় না। তারা শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য বাসস্থানের দায়িত্ব নিয়েছে, তারও অর্থংনৈতিক মূল্য আছে। সে তুলনায় প্রতি বছর লোকসানের পরিমাণ কত?