• ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৮শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সৌদি আরবের মরুভূমিতে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব : ৩৫ বছর পর সাবেক সহকর্মীকে খুঁজে বের করে ঋণ শোধ

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ১২, ২০২৬
সৌদি আরবের মরুভূমিতে গড়ে ওঠা  বন্ধুত্ব : ৩৫ বছর পর সাবেক সহকর্মীকে খুঁজে বের করে ঋণ শোধ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

৩৫ বছর পর সাবেক সহকর্মীকে খুঁজে বের করে ঋণ শোধ

সৌদি আরবে এক বন্ধুর কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। কেটে গেছে তিন দশকের বেশি সময়। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে যোগাযোগের সব মাধ্যম—না ছিল কোনো ফোন নম্বর, না ছিল ঠিকানা। কিন্তু কেরালার এক বাসিন্দার বুকে বেঁচে ছিল শুধু এক টুকরা আবছা স্মৃতি আর বহু বছর আগে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি।

অবশেষে কেবল সেই প্রতিশ্রুতির টানেই বন্ধুর খোঁজে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন কেরালার বাসিন্দা ইসমাইল। আর গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তাঁর সেই দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষ হয় তেলেঙ্গানার জাগতিয়াল জেলার ধর্মপুরী শহরে। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁর পুরোনো বন্ধুর সন্ধান পান এবং তিন দশক আগের নেওয়া সেই ঋণ পরিশোধ করেন।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯১ সালে। ইসমাইল ও এডলা লাচান্না নামের দুই ভারতীয় তরুণ কাজের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবের আবকাইকে। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আরও তিনজন প্রবাসী শ্রমিকের সঙ্গে তাঁরা প্রায় পাঁচ বছর একই ঘরে বসবাস করেন।

সেই সময়েই পারিবারিক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বন্ধু লাচান্নার কাছ থেকে ১২০ সৌদি রিয়াল ধার নিয়েছিলেন ইসমাইল। তৎকালীন সময়ে ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য ছিল এক হাজার রুপির কাছাকাছি। টাকা নেওয়ার সময় ইসমাইল কথা দিয়েছিলেন, সামর্থ্য হলেই তিনি এই অর্থ ফেরত দেবেন।

এর কিছুদিন পরই লাচান্না ভারতে ফিরে আসেন। তখন মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো প্রযুক্তি না থাকায় ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

টাকার অঙ্কটা খুব বেশি বড় না হলেও ইসমাইল কখনোই তাঁর এই ঋণের কথা ভুলে যাননি। সম্প্রতি তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যেভাবেই হোক পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে বের করে তাঁর পাওনা বুঝিয়ে দেবেন।

তবে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। ইসমাইলের কাছে লাচান্নার কোনো ফোন নম্বর বা যোগাযোগের ঠিকানা ছিল না। তাঁর কেবল একটি তথ্যই মনে ছিল—লাচান্নার বাড়ি তেলেঙ্গানার ধর্মপুরীতে।

এই একটিমাত্র তথ্যকে সম্বল করে ইসমাইল ইন্টারনেট ঘেঁটে শহরটি চিহ্নিত করেন এবং সেখানে চলে যান। স্থানীয় লোকজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ও তাঁদের সাহায্য নিয়ে অবশেষে তিনি তাঁর পুরোনো সহকর্মীর বাড়ি খুঁজে বের করতে সক্ষম হন।

দীর্ঘদিন পর বন্ধুকে ফিরে পেয়ে ইসমাইল লাচান্নার পরিবারের হাতে ২৫ হাজার রুপি তুলে দেন। সে সময় লাচান্না নিজে কাজের সূত্রে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছিলেন। সশরীরে দেখা না হলেও ইসমাইল ও লাচান্নার মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলের মাধ্যমে আবেগঘন কথাবার্তা হয়।

১২০ সৌদি রিয়ালের বিপরীতে ২৫ হাজার রুপি পেয়ে বিস্মিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লাচান্না।

ভিডিও কলে লাচান্না বলেন, ‘আমরা দুজনেই সৌদি আরবের আবকাইকে থাকতাম। সন্ধ্যায় আমরা ওর ঘরে যেতাম, একসঙ্গে রান্না করে খেতাম। এভাবেই আমাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়েছিল। পরে আমি ওকে ১২০ রিয়াল ধার দিই। প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। আমি জানি না ও কীভাবে ১২০ রিয়ালের হিসাব করে আমাকে ২৫ হাজার রুপি দিল। ও অত্যন্ত সৎ ও ভালো মনের একজন মানুষ। মূলত আমাদের বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান জানিয়েই ও আমাকে এত বড় অঙ্ক ফেরত দিয়েছে।’

লাচান্না আরও যোগ করেন, ‘ ১৯৯১ সালে ১২০ রিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে ভারতে প্রায় এক হাজার রুপি টাকা পাওয়া যেত। যেহেতু অনেক বছর কেটে গেছে, ও হয়তো হিসাব করে মূল্যস্ফীতি যোগ করে ফেরত দিয়েছে। তবে ও যে এত বছর পর এসে এই টাকাটা ফেরত দিয়ে ওর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, তার জন্য আমি ওর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।’

সৌদি আরবের মরুভূমিতে গড়ে ওঠা দুই তরুণের সেই সাধারণ বন্ধুত্ব আজ এক অনন্য সততার নজির হয়ে রইল তেলেঙ্গানার ধর্মপুরীর সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।