আলবেনিয়ায় মাদক ব্যবসার অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত মায়ামির এক ব্যবসায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের শত কোটি ডলারের রিসোর্ট তৈরির প্রস্তাবিত জায়গার মালিকানার দলিল জাল করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। দেশটির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন সংস্থার নথিপত্র পর্যালোচনা করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যবসায়ী আর্তুর শেহু তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবী কুইতিম চাকরানি নিশ্চিত করেছেন, মাদক চক্রের অর্থ পাচারের অভিযোগে আলবেনিয়ার প্রসিকিউটররা শেহুকে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, শেহু এবং তাঁর সহযোগীরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপের বন্দরগুলোতে কোকেন পাচার করতেন। পরে সেই অর্থ দিয়ে একটি রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন এবং এই কাজে জমির জাল মালিকানা দলিলও ব্যবহার করা হয়।
আইনজীবী চাকরানি বলেন, ‘আর্তুর শেহুর চরিত্র নিয়ে যে সমস্ত অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনোটিই সত্য নয়। তিনি কোনো মাদক পাচারকারী নন, কিংবা সম্পত্তির দলিল জালকারীও নন।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনাব শেহু আলবেনিয়ার প্রসিকিউশনের এই অভিযোগগুলো সম্পর্কে অবগত। তবে এই অভিযোগগুলো তাঁকে উদ্বিগ্ন করছে না। কারণ, তিনি মনে করেন সত্য প্রসিকিউশনের দাবির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
গত এপ্রিলে শেহু আলবেনিয়ার উপকূলবর্তী একটি মনোরম অঞ্চলের জমিটি ‘আলবেনিয়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামক একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। কোম্পানিটির মালিকানার পেছনে রয়েছে জ্যারেড কুশনার সমর্থিত প্রকল্পের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট ও অন্যান্য বিনিয়োগকারী। প্রসিকিউটররা মামলার নথিতে লিখেছেন, ‘প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, উল্লিখিত সম্পত্তিগুলো জাল দলিলের মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছিল।’
নথিপত্রে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট, আলবেনিয়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা রিসোর্ট প্রকল্পের অন্য কোনো বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি। রয়টার্সও এমন কোনো প্রমাণ পায়নি যা থেকে বোঝা যায় যে, জমি কেনার সময় বিনিয়োগকারীরা শেহুকে নিয়ে এই সন্দেহের কথা জানতেন। সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্টের মুখপাত্র শেহুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও জানিয়েছেন, কোম্পানিটি বিশ্বাস করে এই জমি অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ বৈধ ছিল।
বিতর্কিত প্রকল্প
দলিল জালিয়াতির এই অভিযোগ এমন এক হাই-প্রোফাইল প্রকল্পের সামনে নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করল, যা বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে ফেলার অভিযোগে ইতিমধ্যেই ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। প্রকল্পের কাছাকাছি স্ভের্নেক (Zvernec) গ্রামের বাসিন্দারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আদালতে শেহুর এই জমির মালিকানার দাবির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন।
গত মাসে তাঁদের মধ্যে অন্তত এক ডজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জমির মালিকানার দলিল ও করের রেকর্ড দেখিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এই প্রমাণগুলোই বলে দেয় যে তাঁরাই এই জমির প্রকৃত মালিক। তাঁদের আইনজীবী কোস্টান্দিন বেকো বলেন, মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি এবং তাঁরা এই রিসোর্ট প্রকল্প স্থগিত করার জন্য আদালতের আদেশের আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন।
ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র ও বিচ্ছিন্ন দেশ থেকে আলবেনিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের অপেক্ষায় থাকা একটি রাষ্ট্র। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে মহাদেশের অন্যতম শেষ অক্ষত উপকূলজুড়ে এখন নির্মাণকাজের জোয়ার চলছে। কুশনারের অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই রিসোর্টটি এমন এক বন্য সৈকত, বনভূমি এবং জলাভূমির ওপর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা সামুদ্রিক কচ্ছপ ও ফ্ল্যামিঙ্গো পাখিদের আবাসস্থল। এই পাখিগুলোই এখন প্রকল্প বিরোধীদের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যারা এই আন্দোলনকে ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’ নামে অভিহিত করছেন।
কুশনারের স্ত্রী ইভানকা ট্রাম্প জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে একটি ইয়ট থেকে এই উপকূল দেখার সময়ই তিনি ও কুশনার এই রিসোর্টের ধারণাটি মাথায় এনেছিলেন। ২০২৪ সালে কুশনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আর্ট রেন্ডারিং (ডিজাইন) শেয়ার করে এই পরিকল্পনার কথা জানান। যেখানে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে হোটেল, ভিলা, পুল এবং ইয়টের জেটি তৈরি করা হবে। তবে তিনি এখানে ঠিক কত টাকা বিনিয়োগ করছেন, তা প্রকাশ্যে জানাননি।
আলবেনিয়ার সরকার অবশ্য এই পরিকল্পনাকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে এবং তাদের দাবি—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই বিক্ষোভের আয়োজন করছে। প্রধানমন্ত্রী এডি রামা গত মাসে রয়টার্সকে বলেছিলেন, এটি একটি ‘চমৎকার’ প্রকল্প এবং যেকোনো মূল্যেই এটি বাস্তবায়িত হবে। মামলার নথিতে শেহুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, সরকার কোনো ব্যক্তিগত লেনদেনে হস্তক্ষেপ করবে না, তবে প্রকল্পটি আলবেনীয় ও ইইউ আইন মেনেই এগিয়ে চলছে।
ব্রাসেলস অবশ্য ইইউ সদস্যপদপ্রার্থী হিসেবে আলবেনিয়াকে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনের জন্য ইইউর নির্বাহী কমিশনের একজন মুখপাত্র নতুন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আলবেনীয় প্রসিকিউটরদের হস্তক্ষেপ
শেহুর বিরুদ্ধে মামলার নথিপত্র তৈরি করেছে আলবেনিয়ার ‘স্পেশাল স্ট্রাকচার এগেইনস্ট করাপশন অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম’, যা সংক্ষেপে স্পাক নামে পরিচিত। সাধারণ পুলিশ ও প্রসিকিউশন সেবা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থেকে নিজস্ব তদন্তকারী ও প্রসিকিউটরদের মাধ্যমে দুর্নীতি দমনের জন্য ২০১৯ সালে এটি গঠন করা হয়।
এই নথিতে ২০০টি পৃষ্ঠা রয়েছে এবং এগুলো এখনো প্রকাশ করা হয়নি। মামলার নথিপত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সংস্থার একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, স্পাক এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। নথিপত্রগুলোতে ২০২৬ সালের ১২ জুনের তারিখ উল্লেখ রয়েছে। একই দিনে স্পাক মাদক পাচার এবং সেই ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে।
মামলার নথিতে শেহু ও অন্যান্য ব্যক্তিদের পুরো নাম উল্লেখ থাকলেও, গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় সন্দেহভাজনদের কেবল নামের আদ্যক্ষর (ইনিশিয়াল) ব্যবহার করা হয়েছে। আলবেনিয়ার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আগে সন্দেহভাজনদের পুরো নাম প্রকাশ করা হয় না। গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় থাকা আদ্যক্ষরগুলোর সঙ্গে মামলার নথিতে বর্ণিত ব্যক্তিদের পুরো নামের মিল রয়েছে, যার মধ্যে A. Sh নামে চিহ্নিত একজন সন্দেহভাজনও আছেন।
শেহু যে এই তদন্তের মূল লক্ষ্যবস্তু, তা নিশ্চিত করে তাঁর আইনজীবী চাকরানি বলেন, এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে তিনি মোটেও চিন্তিত নন। কারণ, ‘সবাই বিশ্বাস করে’ যে আলবেনিয়ার প্রসিকিউটররা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী মহলের ইশারায় কাজ করেন। তবে ওই ২০ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পাক এখনো কিছু জানায়নি।
মায়ামিতে বসবাসরত আলবেনীয় নাগরিক
স্পাকের নথিতে বলা হয়েছে, শেহু রিসোর্ট প্রকল্পের জন্য প্রায় ১১ কোটি ইউরোতে (১১০ মিলিয়ন) জমি বিক্রি করেছিলেন। এই অর্থ যেন শেহুর কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য একটি নোটারির অ্যাকাউন্টে তা ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নথিতে স্পাক জানিয়েছে, শেহু ও তাঁর সহযোগীরা ‘অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে জমি কিনেছিলেন এবং জাল মালিকানা দলিল তৈরি করে বা কৃত্রিমভাবে জমির আকার বাড়িয়ে ভুয়া সম্পত্তির খতিয়ান তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই সম্পত্তিগুলো অন্যত্র হস্তান্তর বা বিনিময় করা হয়, যাতে কর্তৃপক্ষ সহজে এর উৎস খুঁজে না পায়।’
সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্টের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এখনো বিশ্বাস করি যে—জমির প্রাথমিক অধিগ্রহণ আইনসম্মতভাবে এবং প্রযোজ্য প্রক্রিয়া মেনেই করা হয়েছিল। বরাবরের মতোই, আমরা যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করব।’
শেহুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউটরদের আনা অভিযোগের পরও কেন কোম্পানিটি এই জমি অধিগ্রহণকে বৈধ বলে মনে করছে—রয়টার্সের পক্ষ থেকে সেই ব্যাখ্যা চাওয়া হলে মুখপাত্রের কাছ থেকে আর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। শেহুর আইনজীবী চাকরানি রয়টার্সকে জানান, ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে অটোমান সাম্রাজ্যের আমল থেকেই শেহুর পরিবার এই জমির মালিক এবং শেহু আইনসম্মতভাবেই তা রিসোর্ট বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করেছেন।
চাকরানি শেহুকে একজন সৎ নাগরিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ১৯৯৮ সালে ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ তাঁর ভাই ও চাচাকে তাঁর চোখের সামনে হত্যা করার পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।