• ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৩রা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

পুনঃভর্তি ফি বিতর্ক ও শিক্ষার ‘ন্যায়বিচার’

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ১৭, ২০২৬
পুনঃভর্তি ফি বিতর্ক ও শিক্ষার ‘ন্যায়বিচার’
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

‘একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে’ কথাটি শুধু অনুপ্রেরণামূলক উক্তি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তব সত্য। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের জন্য মানসম্মত, সাশ্রয়ী এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে শিক্ষা যদি ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারে নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের ওপর পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক প্রতি বছর সন্তানের বিদ্যালয়ে পুনর্ভর্তি, উন্নয়ন ফি, সেশন চার্জ, বার্ষিক ফি, পরিচয়পত্র ফি, পরীক্ষার ফি এবং বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাকে নতুন ভর্তি হিসেবে দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত বলে, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হলে ‘পুনর্ভর্তি’ দেখিয়ে ভর্তি ফি আদায় করা আইনসংগত নয়। আদালতের এই নির্দেশ শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই রায় কি বাস্তবে কার্যকর হয়েছে? দেশের বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো ‘পুনর্ভর্তি ফি’ নামটি পরিবর্তন করে ‘উন্নয়ন ফি’, ‘সেশন চার্জ’, ‘বার্ষিক ফি’ বা অন্য কোনো নামে অর্থ আদায় করছে। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একটি আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি আদালতের রায়ের উদ্দেশ্যকেও ব্যাহত করে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ অর্থাৎ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। আর ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে আইনানুগভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। ফলে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালতের রায় বাস্তবায়ন না হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় আইনের শাসনের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। সেই প্রতিষ্ঠান যদি নিজেরাই আদালতের নির্দেশ মানতে অনীহা দেখায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে কী বার্তা পৌঁছাবে? একজন শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয় থেকেই দেখে যে, আইনকে পাশ কাটানোর পথ আছে, তাহলে ভবিষ্যতে তার নাগরিক চেতনা কীভাবে গড়ে উঠবে? এই প্রশ্নগুলো শুধু শিক্ষা প্রশাসনের জন্য নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকে কেন একটি মৌলিক মানবাধিকার বলা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের নীতিমালা এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়। বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশই উপলব্ধি করেছে যে, শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় নিরাপত্তারও অন্যতম ভিত্তি। এ কারণেই শিক্ষাকে বাজারের সাধারণ পণ্যের মতো সম্পূর্ণভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না; রাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ, তদারকি এবং সহায়তার ভূমিকা পালন করে।

যুক্তরাজ্যে সরকারি State School-এ বাধ্যতামূলক শিক্ষার জন্য কোনো টিউশন ফি বা ভর্তি ফি নেওয়া হয় না। সরকার শিক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করে। বেসরকারি Independent School-এ ফি নেওয়া হয়। তবে সেই ফি, অতিরিক্ত চার্জ, অর্থ ফেরতের নীতি এবং অন্যান্য আর্থিক শর্ত আগেই লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হয়। ভোক্তা অধিকার আইনও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রে Public School-এ কিন্ডারগার্টেন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা সাধারণত টিউশনমুক্ত। এর ব্যয় বহন করে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার। তবে বই, পরিবহন বা কিছু কার্যক্রমের জন্য সীমিত খরচ থাকতে পারে। Private School-এ ফি নেওয়া হয়, কিন্তু দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা রাজ্যভিত্তিক হওয়ায় প্রতিটি রাজ্যের আইন আলাদা। গুজরাটে ২০১৭সালের Gujarat Self-Financed Schools (Regulation of Fees) অপ, অনুযায়ী Fee Regulatory Committee ফি নির্ধারণে ভূমিকা পালন করে। রাজস্থানে ২০১৬ সালের Rajasthan Schools (Regulation of Fee) অপ.-এর অধীনে School Level Fee Committee গঠন বাধ্যতামূলক। মহারাষ্ট্রেও ফি নিয়ন্ত্রণে পৃথক আইন রয়েছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বলেছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তিসংগত উদ্বৃত্ত রাখতে পারে, কিন্তু শিক্ষা থেকে অযৌক্তিক মুনাফা অর্জন করতে পারে না। পাকিস্তানে শিক্ষা প্রাদেশিক সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অতিরিক্ত স্কুল ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত অনেক প্রতিষ্ঠানের ফি কমানোর এবং অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ অভিভাবকদের ফেরত বা সমন্বয় করার নির্দেশ দেয়। নেপালের সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ে মৌলিক শিক্ষা বিনা মূল্যে দেওয়ার নীতি রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করে এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখেছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষা বিনা মূল্যে।

বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করে এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখেছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষা বিনা মূল্যে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনো জবাবদিহির উর্ধ্বে হতে পারে না। বাংলাদেশেও যদি শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে কেবল আদালতের রায় দিলেই হবে না; তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। UNESCO-এর দর্শন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে রাষ্ট্র শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যায়। আর যে রাষ্ট্র শিক্ষায় বৈষম্য কমাতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়।

বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনর্ভর্তির নামে অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া এবং শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ রায় দেয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে নির্বাহী বিভাগের ওপর। যেখানে আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ অব্যাহত থাকে, সেখানে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো রায়ের প্রকৃত ব্যাখ্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায়নি, অথবা রায় অনুযায়ী তাদের ফি কাঠামো সংশোধন করেনি। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত মনিটরিং বা তদারকির অভাব থাকলে নিয়ম বাস্তবায়ন দুর্বল হতে পারে। তৃতীয়ত, অনেক অভিভাবক অভিযোগ করলেও কোথায়, কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রতিকার পাবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। এসব বিষয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি।

অনেক উন্নত দেশে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তে অভিভাবক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকে। কারণ বিদ্যালয় ও অভিভাবক পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন; তারা শিক্ষার্থীর কল্যাণে অংশীদার। বাংলাদেশেও পরিচালনা কমিটির পাশাপাশি অভিভাবক পরামর্শ ফোরাম বা ফি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যাতে ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের উত্তর হওয়া উচিত একটাই-কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নয়। শিক্ষা যদি ন্যায়, সততা ও নাগরিক দায়িত্বের পাঠ দেয়, তাহলে সেই পাঠের প্রথম অনুসরণ করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেই।

লেখক: ড. আব্দুল ওয়াদুদ ,  বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক