সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজারকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কোটি টাকার দান-অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলদারত্ব এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো দানবাক্স সিলগালা করে সিসিটিভির নজরদারিতে অর্থ গণনার পর উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। মাত্র ২৫ দিনে দানবাক্স ও ডেক থেকে পাওয়া গেছে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ অর্থ, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, মানতের পশু এবং নানা ধরনের মূল্যবান সামগ্রী।
এই বিপুল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের পর মাজারের দান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে দান আত্মসাৎ, মানতের পশু বারবার বিক্রি, ব্যক্তিগত নজরানা আত্মসাৎ, ভক্তদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে প্রশাসনের তদন্তও শুরু হয়েছে।
শাহজালাল মাজারের সিন্ডিকেট নিয়ে ভয়াবহ তথ্য দিলেন সাবেক ডিসি সারোয়ার আলম
এ বিষয়ে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, আমরা যখন প্রথমবার (২২ জুন) দানের টাকা গুনছিলাম, তখনো হয়তো ৪০-৪৫ ভাগ টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা তারা (মাজারের লোকজন) নগদ হাতে হাতে নিয়েছেন। আর ১১ জুলাই ২০-২৫ ভাগ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।
তিনি বলেন, মূলত টাকাটা ওঠে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকা থেকে। সেখানে তারা হাতে হাতে টাকা নেন। যারা টাকা নেন তারা ভক্তদের স্পষ্টই বলেন, ‘আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তাহলে আমাদের কাছে দেন, আর যদি সরকারকে দিতে চান তাহলে এই বক্সের মধ্যে ফেলেন।’ এই কারণে দানবাক্স ও ডেকে টাকাটা কম এসেছে।
প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশ গড়ে তুলেছে অপরাধ নেটওয়ার্ক
জানা গেছে, মাজারে প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশ গড়ে তুলেছে অপরাধ নেটওয়ার্ক। খাদেমের মধ্যে মুরুব্বি হলেন ৩০ জন। কেরানি সামুন মাহমুদ খান ও খোকন ওরফে বকরি খোকনের আশীর্বাদে এই ৩০ জন মাজারের দৈনিক আয়ের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
প্রতিদিন ফজর থেকে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি নির্ধারণ করা থাকে। এই ২৪ ঘণ্টার বারি চলাকালে মাজারের বিভিন্ন খাত থেকে গড়ে ৪-৫ লাখ টাকা নগদ সংগৃহীত হয়।
বৃহস্পতিবার, শুক্রবার কিংবা ছুটির দিনে ভক্তদের ঢল নামলে দৈনিক আয় ১০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এই আয়ের সিংহভাগ বারি পাওয়া খাদেম ও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ভাগ করে নেন।
সাত শতকের ব্যবস্থাপনায় প্রথমবার প্রশাসনিক নজরদারি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৭০০ বছর ধরে মাজারের দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থের কোনো আধুনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, দানবাক্স খুলে নগদ অর্থ বস্তায় ভরে প্রভাবশালী একটি মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। কোথায় কত টাকা জমা হচ্ছে কিংবা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হতো না।
এ পরিস্থিতিতে জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হলে গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে। পরে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের উপস্থিতিতে দান গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২৫ দিনের দানে ৬৪ লাখ টাকা, মিলল বিদেশি মুদ্রা-স্বর্ণালংকার
২২ জুন প্রথম দফায় চার দিনের দান গণনা করে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এরপর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় আরও ১৯ দিনের দান গণনা করে উদ্ধার হয় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। দুই দফায় মোট ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা নগদ পাওয়া যায়।
এর পাশাপাশি ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, মূল্যবান সামগ্রী, নানা ভাষায় লেখা চিঠি, মানতের চিরকুট এবং ৬৫টি ছাগলসহ গবাদিপশুও পাওয়া যায়।
‘হাতে হাতে দান নেওয়ায় দানবাক্সে টাকা কম এসেছে’
সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম দাবি করেন, প্রকৃত দানের বড় একটি অংশ দানবাক্সে পৌঁছায়নি। তার ভাষ্য, প্রথম দফায় প্রকৃত দানের মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় দফায় ২০-২৫ শতাংশ অর্থ দানবাক্সে এসেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকায় ভক্তদের কাছ থেকে সরাসরি হাতে হাতে দান নেওয়া হতো। অনেককে বলা হতো—“মাজারকে দিতে চাইলে আমাদের হাতে দিন, আর সরকারকে দিতে চাইলে দানবাক্সে ফেলুন।” ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দানবাক্সের বাইরে থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
দানবাক্স ঘিরে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাজারের মোতাওয়াল্লি, খাদেম ও কেরানিদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দানবাক্স, ডেক এবং মাজারের অন্যান্য আয়ের উৎসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ থেকে আগত ধনী ভক্ত, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরা মাজারের উদ্দেশ্যে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা খাদেমদের হাতে তুলে দিলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নামে স্থাপিত দানবাক্স থেকেও সংগৃহীত অর্থ একটি প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মানতের পশু নিয়েও অভিযোগ
মাজারে আসা মানতের গরু-ছাগল নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ভক্তদের দেওয়া মানতের পশু নির্দিষ্ট গোয়ালঘরে রেখে পরবর্তীতে নতুন মানতের নামে বারবার বিক্রি করা হয়। একই পশু একাধিকবার বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এছাড়া পশু জবাই, রান্না এবং মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত বিল আদায়, মাংস কমিয়ে দেওয়া, চামড়ার সঙ্গে মাংস রেখে আত্মসাৎ এবং শিন্নির অংশ কমিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।
দৈনিক লাখ লাখ টাকার আয়ের অভিযোগ
মাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিদিন নির্ধারিত একজন খাদেমের ‘বারি’ বা দায়িত্বকাল থাকে। ওই ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন উৎস থেকে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ সংগ্রহ হয়। বৃহস্পতি, শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিনে এ আয় ১০ লাখ টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অর্থের বড় অংশ প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মাজারকে ঘিরে পকেটমার, ছিনতাইকারী, জুতাচোরসহ বিভিন্ন অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এসব চক্র থেকে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশও প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া প্রতিবাদকারীদের ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে।
নারী ইবাদতখানা বন্ধ নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, দানবাক্সে সরাসরি দান কমিয়ে দেখানোর উদ্দেশ্যে নারী ইবাদতখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে নারীরা দানবাক্সে সহজে দান করতে না পারেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মোতাওয়াল্লির বক্তব্য
মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, মাজারের বিভিন্ন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। তবে সিসিটিভি স্থাপন, দানবাক্স সিলগালা এবং প্রশাসনের নেওয়া কিছু পদক্ষেপকে তিনি অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেন।
তার দাবি, মাজারের নিরাপত্তাকর্মীরা নিয়মিত পকেটমার ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
দুদকের অবস্থান
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বলেন, বর্তমানে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কমিশন গঠনের পর অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শুরু করা হবে।