১৮ জুলাই ২০২৪। সেদিন বারবার আমার মনে হয়েছিল, আজ হয়তো আমি মারা যাব।
হয়তো আর মায়ের ফোন ধরতে পারব না। হয়তো বাবা আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারবেন না।
আজ ১৮ জুলাই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম দিকের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি এবং আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
ইতিহাস হয়তো দিনটিকে নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে মনে রাখবে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে ১৮ জুলাই ফিরে আসে কিছু মুখ, কিছু রক্তাক্ত দৃশ্য, টিয়ারশেলের ধোঁয়া, একটি মরদেহ এবং দিনের শেষে বাবার বলা দুটি বাক্য হয়ে।
সেদিন সকালে আমরা নর্থ সাউথ, আইইউবি ও এআইইউবির শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা গেটে একত্রিত হয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ হামলা চালাচ্ছে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, নর্থ সাউথ থেকে মিছিল নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাব।
আমাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষও ছিলেন। মিছিল কিছুদূর এগোতেই দেখি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ববি হাজ্জাজ স্যার তাঁর দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের চলে যাওয়ার জন্য আলাদা পথ করে দিতে বললেন। পুলিশ সামনে চলে যাওয়ার পর আমরা মিছিল নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোতে থাকি।
কিন্তু পথে আমাদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালানো হয়।
টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলির মধ্যে আমাদের মিছিল বারবার ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল। বাঁচার জন্য আমিও কখনো কোনো দোকানে, কখনো রাস্তার পাশের নিরাপদ মনে হওয়া কোনো জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছিলাম।
একপর্যায়ে একটি ফার্মেসিতে ঢুকে দেখি, একজন ভাইয়ের হাতে গুলি লেগেছে। তিনি নিজের হাত থেকে গুলিটি বের করার চেষ্টা করছিলেন। দৃশ্যটি এতটাই ভয়ংকর ছিল যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তখন মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো আন্দোলনে নেই। আমরা যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।
তারপরও কিছুক্ষণ পর সাহস সঞ্চয় করে আবার বের হয়ে পড়ি।
আবার হামলা হলো। ততক্ষণে পরিচিতদের প্রায় সবাই একে অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ চোখের সামনে দেখি, একজন ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন। আশপাশের মানুষ তাঁকে তুলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। চোখ প্রচণ্ড জ্বলছিল। এর মধ্যে কে যেন আমার পায়ে খুব জোরে আঘাত করল। আমি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ে চিৎকার করতে শুরু করি। কয়েকজন আমাকে ধরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। আতঙ্কের মধ্যে যে যা জানতেন, তা দিয়েই আমার চোখের জ্বালা কমানোর চেষ্টা করছিলেন।
একটু সামলে নিয়েই আবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা দিই। কাছাকাছি পৌঁছে দেখি কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভবনে আগুন। চারদিকে ধোঁয়া, গুলির শব্দ আর মানুষের ছোটাছুটি। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও আমি পরিচিত সহযোদ্ধাদের খুঁজছিলাম।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে পৌঁছানোর পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই।
চোখ খুলে দেখি, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে। কিছুক্ষণ পর সামনে তাকিয়ে দেখি, আমার বন্ধু জিহাদের চোখ ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে।
আমি জোরে ডাকলাম, “জিহাদ?”
ও আমাকে দেখেই বলল, “তুই এখানে কীভাবে আসলি? তুই ঠিক আছিস? তোর কিছু হয়নি তো?”
আমি বললাম, “তোর চোখ আর মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে, কী হয়েছে?”
তখন জানতে পারি, ওর চোখ ও মুখে স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়েছে। অথচ নিজে আহত অবস্থায় থেকেও সে আমার কথা জানতে চাইছিল।
একটু সুস্থ হতেই আমি বললাম, আমাকে লবিতে নিয়ে যেতে। কারণ আমার চেয়েও অনেক বেশি আহত ভাই ও বোন সেখানে ছিলেন। চিকিৎসার প্রয়োজন তাঁদেরই বেশি ছিল।
এত মানুষকে আহত হতে দেখে আমি আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারছিলাম না। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলাম। লবিতে বসে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনছিলাম। পরে জানতে পারি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিতে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর লবির সামনে গিয়ে ওপর থেকে নিচে তাকাতেই দেখি, একটি মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সেই দৃশ্য দেখে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। চিৎকার করে বলছিলাম,
“ওরা আমার ভাইকে মেরে ফেলছে। জালিমের বাচ্চারা আমার ভাইকে মেরে ফেলছে।”
আহত অবস্থায় জিহাদই আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আশপাশের মানুষ আমাকে বলছিলেন, আমি যেন ভেঙে না পড়ি, যেন সাহস রাখি। হয়তো তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের একজন ভেঙে পড়লে তার সঙ্গে আরও কয়েকজনের সাহসও ভেঙে পড়বে।
বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার দিকে গুলির শব্দ কিছুটা কমলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করি। প্রথমবার বের হয়ে বুঝতে পারি, পরিস্থিতি তখনো নিরাপদ নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ফিরে যাই।
প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে একটি রিকশা পাই এবং বসুন্ধরা গেটের সামনে ফিরে আসি। সেখানে তখনো তীব্র আন্দোলন চলছিল।
বাসা থেকে বারবার ফোন আসছিল। মা কাঁদছিলেন। শুধু জানতে চাইছিলেন, আমি ঠিক আছি কি না এবং কখন বাসায় ফিরব।
কিন্তু বসুন্ধরা থেকে কোনো যানবাহন মিরপুরের দিকে যেতে চাইছিল না। মিরপুর ১০ তখন আরেকটি রণক্ষেত্র।
রাত নয়টা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি পেলাম না। বাবা ফোন করে বললেন, বসুন্ধরায় রাত কাটানোর মতো কোনো আশ্রয় খুঁজতে। অনেকজনকে ফোন করেও থাকার জায়গা পাইনি। মানুষ ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ তখন খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, পুলিশ বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে শিক্ষার্থী পেলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত বাবা একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে মিরপুর থেকে বসুন্ধরা গেটে এলেন আমাকে নিতে।
বাসায় ফেরার পুরো পথে বাবা আমার কাছ থেকে দিনের সব ঘটনা শুনলেন। আমি তাঁকে গুলি, টিয়ারশেল, আহত মানুষ, জিহাদ এবং নিজের চোখের সামনে দেখা সেই মরদেহের কথা বললাম।
বাসায় পৌঁছে বাবা শুধু বলেছিলেন,
“তুমি আন্দোলনে যাও, সমস্যা নেই। কিন্তু নিজের খেয়াল রেখো।”
সন্তান হারানোর ভয় নিশ্চয়ই তাঁর মধ্যেও ছিল। হয়তো তিনি ভয়টি আমার সামনে প্রকাশ করেননি। কারণ সেদিন আমাদের দুজনেরই বোঝা হয়ে গিয়েছিল, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করলে শেষ পর্যন্ত কোনো সন্তানই নিরাপদ থাকবে না।
১৮ জুলাই আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, হয়তো আর বেঁচে ফিরব না। আমি ফিরেছিলাম। কিন্তু সেদিন আমার অনেক ভাই আর ফেরেননি। অসংখ্য মানুষ শরীরে এবং মনে স্থায়ী ক্ষত নিয়ে ফিরেছিলেন।
যাদের একসময় বলা হতো রাজনীতি বিমুখ, সেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই সেদিন গুলি, টিয়ারশেল ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে রাজপথের সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাই ও বোনেরা নিজেদের জীবন এবং রক্ত দিয়ে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছেন।
তাঁদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে নতুন শক্তি দিয়েছিল এবং পূর্ণমাত্রার ছাত্র ও জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
আজ টকশোর চেয়ারে বসে খুনি আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে নতুন বয়ান তৈরি করা খুব সহজ। জুলাইকে “Julie” বানিয়ে ব্যঙ্গ করা এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে তুচ্ছ করাও তাদের কাছে সহজ।
কারণ এই সংগ্রাম তাঁরা করেননি। তাঁদের শরীর থেকে রক্ত ঝরেনি। গুলির সামনে তাঁদের দাঁড়াতে হয়নি। টিয়ারশেলের ধোঁয়ার মধ্যে তাঁদের শ্বাস নিতে হয়নি। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তাঁদের পরিবারকে বহন করতে হয়নি।
যারা রাজপথের সেই দিনগুলো দেখেনি, তারা হয়তো টকশোতে বসে জুলাইয়ের ইতিহাস নিজেদের সুবিধামতো বদলে দিতে চাইবে। কিন্তু হাজারো সাজানো বয়ান দিয়েও শহীদদের রক্তে লেখা সত্য মুছে ফেলা যাবে না।
আমাদের ভাই ও বোনেরা জীবন দিয়েছেন। হাজারো আহত যোদ্ধা আজও জুলাইয়ের ক্ষত শরীরে এবং মনে বহন করছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারণার উপকরণ নয়। তাঁদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অধিকার কারও নেই।
হত্যার নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিচার হতে হবে। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো টকশো, অপপ্রচার অথবা সাজানো রাজনৈতিক বয়ান সেই বিচার থামাতে পারবে না।
কারণ আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।
আজকের দিনটি তাই শুধু স্মরণ করার দিন নয়। এটি সত্য রক্ষা করার দিন, বিচার দাবি করার দিন এবং শহীদদের রক্তের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা মনে রাখার দিন।
১৮ জুলাই আমাকে শিখিয়েছে, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। সাহস মানে মৃত্যুভয় সঙ্গে নিয়েও অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।
আমি আজও সেই দিনটির কথা লিখি তাঁদের জন্য, যাঁরা ঘরে ফিরতে পারেননি। লিখি যেন তাঁদের রক্ত, সাহস ও আত্মত্যাগ কোনো দিন শুধু একটি তারিখে পরিণত না হয়।
১৮ জুলাই আমাদের প্রতিরোধের দিন।
– নাফসিন মেহেনাজ আজিরিন এর ফেইবুকের পোস্টে