একদিনের নাটকীয় সংঘর্ষের পর ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর-মন্তরে আবারও অবস্থান নিয়েছে ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে সংগঠনটি ঘোষণা দিয়েছে, তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) পুলিশ যন্তর-মন্তর থেকে আন্দোলনকারীদের মঞ্চ ও তাঁবু সরিয়ে দিলেও মঙ্গলবার ভোর থেকেই সিজেপির আহ্বানে বিক্ষোভকারীরা আবার সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) মোতায়েন করা হয়েছে।
সিজেপির ডাকে মঙ্গলবার সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীরা আসতে শুরু করে। এর আগে পার্লামেন্ট অভিমুখে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে হাজারো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে রাজধানীতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী আহত হন। একপর্যায়ে সংসদ ভবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান বিক্ষোভকারীরা।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, সোমবারের কর্মসূচিতে প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা ‘উচ্ছৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ আচরণ করেছেন। বারবার সতর্ক করা এবং আইনসম্মত নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তারা ছত্রভঙ্গ হননি এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছেন।
অপরদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে দিল্লি পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে, যাতে বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা শুরু হয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা তার বাসভবনে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাদের দাবিগুলো শোনেন। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
বৈঠকে সিজেপি তিনটি দাবি তুলে ধরে। সেগুলো হলো— সোনম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত মুক্তি ও তার চলাচলে কোনো বিধিনিষেধ না রাখা, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ২০২৬ সালের নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা সব পরীক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ প্রদান।
বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সিজেপি নেতারা তার কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। সিজেপির পক্ষ থেকেই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
আলোচনা শেষে সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, মন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে উপযুক্ত পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে এখনও কোনও সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি মেলেনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থামবে না।
অপরদিকে সোনম ওয়াংচুকও ঘোষণা দিয়েছেন, তরুণ আন্দোলনকারীদের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সংসদ ভবনে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া না হলে অথবা তারা হাসপাতালে এসে তার সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো সামাজিক মাধ্যমে তার স্বামীর হাতে লেখা একটি বার্তা প্রকাশ করেছেন। সেখানে ওয়াংচুক লিখেছেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত তরুণদের সঙ্গে যেভাবে কঠোর আচরণ করা হচ্ছে, তা দেখে আমি অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তরুণ নেতাদের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত অথবা আমাকে হাসপাতালে এসে দেখা না করা পর্যন্ত আমার অনশন চলবে।’
ককরোচ পার্টির আন্দোলনের মধ্যেই রাস্তায় কৃষকরা, উত্তাল ভারত
একদিকে প্রশাসনিক নীতি ও ব্যবস্থার প্রতিবাদে তরুণ ও নাগরিক সমাজের অভিনব ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ ‘দিল্লি চলো’ হাঁক। অন্যদিকে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া পাঞ্জাবের শত শত কৃষককে শম্ভু সীমান্তে আটকে দিয়েছে হরিয়ানা পুলিশ— এই দুইয়ের ধাক্কায় দিল্লি এখন দ্বিমুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) হরিয়ানায় প্রবেশের মুখে সিমেন্টের ব্লক, লোহার কাঁটা ও বহুতল ব্যারিকেড বসিয়ে পথ অবরুদ্ধ করা হয়, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

রাজধানীতে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে কৃষকরা শম্ভু সীমান্তেই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছেন এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারে বাধা দেওয়ার জন্য পাঞ্জাব ও হরিয়ানা উভয় সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বিকেইউ শহীদ ভগত সিং প্রধান তেজবীর সিং অভিযোগ করেন যে হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের সীমানার ভেতরে ঢুকে ব্যারিকেড তৈরি করলেও পাঞ্জাব সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। পাঞ্জাবের পথ অবরুদ্ধ করা হলেও অম্বালা, কুরক্ষেত্র ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর হরিয়ানা কৃষকরা দিল্লির উদ্দেশ্যে তাদেরযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
দেশ বাঁচাও মোর্চার ব্যানারে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের কৃষক সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে এই কিষাণ মহাপঞ্চায়েতের ডাক দিয়েছে। কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ কমিটির নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের জানান যে কিষাণ মজদুর মোর্চা, আজাদ কিষাণ মোর্চা ও বিকেইউ একতা সংঘর্ষের কনভয়গুলো পাঞ্জাবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রওনা হলেও শম্ভু সীমান্তে বাধাগ্রস্ত হয়। পান্ধের উল্লেখ করেন যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ভারত-মার্কিন যৌথ বিবৃতিতে ২০২৬ সালের শরতের মধ্যে বহু-খাতভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রথম কিস্তি চূড়ান্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কৃষক নেতাদের দাবি এই চুক্তিটি কেবল প্রথাগত বাণিজ্য নয়, বরং কৃষি, দুগ্ধ, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, সরকারি কেনাকাটা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার ও সেবা খাতকে উন্মুক্ত করে দেবে।
অতীতেও মার্কিন বাণিজ্য রিপোর্টে সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য ও পোল্ট্রির ওপর শুল্ক কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। ভারতের বাজারে ভর্তুকিপ্রাপ্ত আমেরিকান কৃষিপণ্য প্রবেশ করলে কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না এবং স্বচ্ছতার অভাবে এই আলোচনার বিস্তারিত গোপনে রাখা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ তোলেন।
কৃষক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে যে ভারতের দুগ্ধ খাত প্রায় ৮০ মিলিয়ন গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে, যা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। দেশ বাঁচাও মোর্চা কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সব নথি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করার এবং কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার জোর দাবি জানিয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি