• ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৯ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

তিন দিন পর মিলেছিল শহীদ রাব্বির লাশ, জানাজায়ও হানা পুলিশের

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ২২, ২০২৬
তিন দিন পর মিলেছিল শহীদ রাব্বির লাশ, জানাজায়ও হানা পুলিশের
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

রাজধানীর ক্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকরাম খান রাব্বির (২৮) শাহাদতের দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সেদিন বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় দলের ক্রিকেটার এনামুল হক বিজয়ের একটি শোরুমে চাকরি করতেন। সেই আয়ের অর্থ দিয়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের খাবার কিনে দিতেন তিনি। কিন্তু আন্দোলনের মিছিলে থাকাবস্থায় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি থামিয়ে দেয় তার জীবন। থেমে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও নির্ভরতার গল্পও। আমার দেশকে এসব কথা জানান রাব্বির বাবা ফারুক খান।

তিনি বলেন, সে নিয়মিত আন্দোলনে যেত। অফিস শেষে ছুটে যেত মিছিলে। নিজের টাকায় আন্দোলনে থাকা ছেলেমেয়েদের খাবার কিনে দিত। ওর ভেতরে যে দেশপ্রেম ছিল, এ দেশ যদি তা বুঝত, তাহলে হয়তো গুলি ছোড়ার আগে একবার ভাবত। কিন্তু তারা ভাবেনি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের পর কাফরুল থানার পূর্ব বাইশটেকের বাসা থেকে বের হন রাব্বি। উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া। মা বিউটি আক্তার জানান, সেদিন ছেলের আচরণ ছিল অন্যরকম। বের হওয়ার সময় বারবার বলছিল, ‘আম্মু, দরজাটা লাগিয়ে দাও।’ আমি তখন বিষয়টি বুঝিনি। এখন মনে হয়, ওর চোখে ছিল শেষবার দেখার ব্যাকুলতা।

বন্ধুদের সঙ্গে মিরপুর-১০ এলাকায় পৌঁছে আন্দোলনে যোগ দেন রাব্বি। তখন এলাকাটি সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনা ও জুনায়েদ আহমেদ পলকের নির্দেশে ইন্টারনেটসেবা বন্ধ করে দেয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বর্বরোচিত হামলায় আন্দোলনরত শতাধিক ছাত্র-জনতা সেদিন সেখানে গুলিবিদ্ধ হন। এসব দেখেও বাসায় ফিরে যাননি রাব্বি। আন্দোলনস্থলেই ছিলেন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। বিকাল ৪টা ১৭ মিনিটের দিকে শহীদ আবু তালেব স্কুলের সামনে রাব্বির বুক ও পেটে গুলি লাগে। কিছুক্ষণ পর রাব্বির এক বন্ধু বাবা ফারুক খানকে ফোন করে জানান, রাব্বির শরীরে গুলি লেগেছে। তাকে মিরপুর-১১-এর ইসলামিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

ফারুক খান বলেন, তখন আমি বাসা থেকে বের হয়ে মিরপুর-১১ নম্বরের দিকে যেতে থাকি। সে সময় তার বন্ধু আবার আমাকে ফোন করে জানায়, এই হাসপাতালে রাব্বিকে চিকিৎসা দেবে না। তাই ওকে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, আপনি ঢাকা মেডিকেলে আসেন। আমি অনেক কষ্ট করে ঢাকা মেডিকেলে যাই।

ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে ছেলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফারুক খান। বলেন, সেখানে পৌঁছানোর পর আমার চোখে পড়ে, রক্তে ভেজা গেঞ্জি গায়ে হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছে কলিজার টুকরা ছেলের নিথর দেহ। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। আল্লাহ তাকে শাহাদতের মৃত্যু দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও চলমান রাজনৈতিক উত্তাপজুলাই-অভুত্থ্যান
তিনদিন মর্গে পড়ে ছিল লাশ

ফারুক খানের অভিযোগ, সেদিন হাসপাতাল থেকে লাশ নিতে গেলে তাকে জানানো হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া লাশ হস্তান্তর করা যাবে না। তিনি বলেন, পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে লাশ হিমঘরে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেদিন লাশ পাইনি।

এদিকে, ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মা বিউটি আক্তার। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই রাত ১২টার দিকে ওর বাবা বাসায় ফেরে। আমি দরজা খুলে দিতেই ওর বাবার শরীর থেকে আতরের গন্ধ আসে। আমি বুঝে ফেলি তখনই। তারপরও রাব্বির বাবাকে বলি, তোমার শরীরে আতরের গন্ধ কেন? তাহলে আমার রাব্বি কি আর নেই? বিউটি আক্তারের এমন প্রশ্নে পুরো ফ্ল্যাটে শোকের ছায়া নেমে আসে।

পরদিন সকাল থেকে ছেলের লাশ নিতে ফারুক খান ছুটতে থাকেন এক থানা থেকে আরেক থানায়। সবাই বলে—উপরের অনুমতি লাগবে। কিন্তু সে অনুমতি আসেনি। এভাবে কেটে যায় দুদিন। অনেক কষ্টে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তৃতীয় দিন ২১ জুলাই লাশ বুঝে পান। তবে অর্ধগলিত অবস্থায়। পাঁচ হাজার টাকা ঘুস নিলেও হিমঘরে রাখা হয়নি রাব্বির লাশ। তিনদিন ধরে বাইরে পড়ে থাকায় লাশে পচন ধরে। তারপরও পরিবার গ্রহণ করে রাব্বির লাশ।

ছেলের মুখটাও দেখতে পারেননি মা

এই তিনদিন ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন মা বিউটি আক্তার। তিনি বলেন, সবাইকে বলেছিলাম আমাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে। কেউ নিয়ে যায়নি। ২১ জুলাই সকালে শুনলাম, আজ আমার বাবার লাশ নিয়ে আসবে। সকাল থেকে নিচে অপেক্ষা করেছিলাম। ভাবছিলাম, শেষবারের মতো একটু দেখব, একটু আদর করব, একটা চুমু খাব। কিন্তু এমন হতভাগ্য মা আমি, ছেলের লাশটিও দেখতে পারিনি। আমার জীবনটাই বৃথা।

ইতিহাসের ভুল ঘোড়ায় সওয়ার কারাইতিহাসের-ভুল-ঘোড়ায়-সওয়ার-কারা
জানাজা থেকে বাবাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা

শহীদ রাব্বির লাশ বাসায় আনার পর জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করতে থাকেন স্বজনরা। কিন্তু সেখানেও থেমে থাকেনি আওয়ামী স্বৈরচারী গোষ্ঠীর হিংস্রতা। শহীদ রাব্বির জানাজার জন্য যখন সবকিছু প্রস্তুত, তখন পুলিশ আসে তার বাবা ফারুক খানকে গ্রেপ্তার করতে। তবে এলাকাবাসীর বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। জানাজা শেষে সন্ধ্যায় মিরপুরের পূর্ব বাইশটেক কবরস্থানে দাফন করা হয় শহীদ রাব্বিকে।

ও শুধু আমার ছেলে ছিল না, আমার বন্ধুও ছিল

ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বিউটি আক্তার। তিনি বলেন, আমি ছেলের গায়ে হাত দিতে পারিনি, একটি চুমুও খেতে পারিনি। ও শুধু আমার ছেলে ছিল না, আমার বন্ধু ছিল। আমার মা-বাবার শূন্যতাও পূরণ করত। মাথায় তেল দিত, পায়ের নখ কেটে দিত। এখন কেউ আর জিজ্ঞাসা করে না, ‘আম্মু, কিছু লাগবে?’ আমি গর্বিত যে, আমি শহীদ রাব্বির মা। কিন্তু সে গর্ব এখন শুধু কান্না হয়ে ঝরে পড়ে। এখনো আমার ছেলে হত্যার বিচার পাইনি।

বিচার নিশ্চিতের দাবি শহীদ পরিবারগুলোর

বাবা ফারুক খান আর মা বিউটি আক্তারের ঘরে পড়ে আছে রাব্বির ছবিগুলো, জামার গন্ধ আর একরাশ শূন্যতা। এ শূন্যতা নিয়ে ফারুক খান বলেন, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের কাছে শহীদের পিতা হিসেবে আমার একটি আবেদন, যে আওয়ামী লীগ আমার ছেলে এবং এ দেশের হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে, তারা যেন এ দেশের মাটিতে আর রাজনীতি করার সুযোগ না পায়। এটাই আমার এবং সব শহীদ পরিবারের চাওয়া।