• ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আগামী সপ্তাহে

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ৩০, ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আগামী সপ্তাহে
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

বড় কোনো মতপার্থক্য না থাকায় আগামী সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হতে যাচ্ছে। চূড়ান্ত নেগোসিয়েশন বা দরকষাকষির জন্য বাংলাদেশ থেকে ১৩ সদস্যের একটি বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে রয়েছে। সেখানে তারা পঞ্চম বা চূড়ান্ত দফার আলোচনা করছে। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এ আলোচনা চলবে। এর পর চূড়ান্ত আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে। আগামী ৪ আগস্ট আলোচনা শেষে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সি-ইপিএ) বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এ চুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয়—এমন সব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমু্ক্ত প্রবেশাধিকার ও কিছু সেবা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চার বিষয়ে চুক্তির জন্য একমত হয়েছে দুই দেশ। বাকি আরও আট বিষয় চূড়ান্ত হবে চলমান বৈঠকে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাপানের সঙ্গে ইপিএ হওয়ার পর বাংলাদেশের জন্য এটা দ্বিতীয় ইপিএ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (এফটিএ) নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ওই প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন, কাস্টমসের দুজন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দুজন ও সংসদ সচিবালয়ের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন। বাকি সবাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। পাঁচ দিনের এ সফরে গতকাল মঙ্গলবারও সিউলে কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে। এর মধ্যে দুপুরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান ঢাকা থেকে অনলাইনে যুক্ত হন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধা ধরে রাখা এবং আরও বাড়ানো। বর্তমানে ১২টি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাটপণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকার, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এ সুবিধা বহাল রাখা, কোন কোন পণ্যে রুলস অব অরিজিনের আওতায় রাখা হবে, আইটি, প্রকৌশল, আর্থিক সেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা খাতে বাজারে প্রবেশের সুযোগ। দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানো, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য দ্রুত ছাড় এবং ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপারটি) পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট সুরক্ষা, চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো বিরোধ হলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে, এসব বিষয় প্রধান্য পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো সহযোগিতার বিষয়গুলোও রয়েছে।

বাংলাদেশ চায় উৎপাদনে বিদেশি কাঁচামাল ব্যবহার করলেও যুক্তিসংগত মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে পণ্যটি ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাক। এতে তৈরি পোশাক, ওষুধসহ অন্যান্য শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্প এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) কোরিয়ান বিনিয়োগ বৃদ্ধির আলোচনাও রয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করা, যাতে এলডিসি-উত্তরণের পরও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে কোরিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি দেশে আনা যায়।

বিপরীতে কোরিয়াও চায় বাংলাদেশে তাদের পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পাক। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, সড়ক এবং বিমান চলাচলসহ জাতীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাদের হিস্যা আরও বাড়ানো তাদের অন্যতম লক্ষ্য। কোরিয়া আশা করছে সিইপিএ কোরীয় নির্মাণ এবং প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য আরও সুযোগ তৈরি করবে।

জানা যায়, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয় প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশ প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (নিট ও ওভেন); হোম টেক্সটাইল; চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; জুতা; ওষুধ; পাট ও পাটজাত পণ্য; হিমায়িত খাদ্য; সিরামিক পণ্য।

বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের প্রধান আমদানিকৃত পণ্যগুলো হলো লোহা ও ইস্পাত; যন্ত্রপাতি ও শিল্প মেশিনারি; বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম; প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য; রাসায়নিক পদার্থ; কাগজ ও কাগজজাত পণ্য।

সিউল সফরে ১৩ সদস্যের নেগোসিয়েশন টিমে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ। জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আলোচনায় বড় কোনো মতপার্থক্য দেখা দেয়নি। আলোচনা মোটামুটি দুই পক্ষের অনুকূলেই চলছে। সামান্য কিছু বিষয় নিয়ে শেষ আলোচনা হচ্ছে। আগামী শুক্রবার সিউলের আলোচনা শেষ হবে। এর পর আগামী ৩ বা ৪ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প, বাণিজ্য ও সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসবে। এ সময় চূড়ান্ত আলোচনা ও চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও এখন তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। চুক্তির পর আশা করা যায় আরও কমবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। আর চতুর্থ দফার নেগোসিয়েশন হয় ঢাকায় চলতি বছরের ১৪ থেকে ১৯ জুন।