সৌরজগতের অন্য গ্রহগুলোর তুলনায় শনি বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত। নিজস্ব বলয় এবং গ্রহটিকে ঘিরে থাকা মেঘের আস্তরণের কারণে এটি নিয়ে খুব বেশি গবেষণার সুযোগ পাননি বিজ্ঞানীরা। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, শনির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও সেখানে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে পানি বা বরফের পরিবর্তে গ্রহটিতে হীরা তৈরি হয়। আর সেই পরিমাণও নেহাত কম নয়; বছরে অন্তত ১ হাজার টন হীরা তৈরি হওয়াও সেখানে অসম্ভব কিছু নয়।
শুনতে কল্পকাহিনি মনে হলেও বিজ্ঞানীদের দাবি—হীরা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপযুক্ত পরিবেশ ও উপাদান সবই শনিতে উপস্থিত। সেখানে প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ ঘটে, পাশাপাশি বায়ুর চাপ এবং তাপমাত্রাও অত্যন্ত বেশি। তাই সেখানে সবসময় হীরা তৈরি হওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয় বলেই মনে করছেন তারা।
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শনিতে বছরে এক হাজার টন হিরে তৈরি হয়ে গ্রহের অতলে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, শনির গভীরে যে মাত্রার বিপুল তাপ রয়েছে, তাতে অনেক হীরা গলে তরলেও পরিণত হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ প্রক্রিয়ার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিজ্ঞানীরা এখনো পাননি কিংবা কোনো মহাকাশযানের ছবিতেও তা ধরা পড়েনি, তবুও বিজ্ঞানীরা শনির মতো একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তাতেই বিজ্ঞানীদের একটি অংশ শনিতে প্রতিদিন হীরা তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন।
শনির বায়ুমণ্ডলে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পাশাপাশি প্রচুর মিথেন গ্যাস রয়েছে। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেভিন বাইনেস এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা যৌথভাবে এ বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে, যা বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, শনিতে মাঝে মধ্যেই প্রচণ্ড ঝড় হয়। ঝড়ের সময় যখন বজ্রপাত হয়, তখন মিথেন গ্যাসের অণুগুলো ভেঙে গিয়ে কার্বন উৎপন্ন করে এবং তা ভুসাকালিতে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডল থেকে নিচে ঝরে পড়তে থাকে। কার্বনকণাগুলো যতই শনির বায়ুমণ্ডলের ভেতরের দিকে নামতে থাকে, সেখানে চাপ ও তাপমাত্রা দুটিই তত বাড়তে থাকে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, কার্বন তখন গ্রাফাইটে পরিণত হয় (যা সাধারণত পেনসিলের সিসে ব্যবহৃত হয়)। গ্রহটির আরও গভীরে বায়ুর চাপ অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই কার্বন কণাই একপর্যায়ে শক্ত হীরাতে রূপ নেয়। বিজ্ঞানীরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর চেয়ে শনি আয়তনে অনেক বড় এবং এর বায়ুমণ্ডলের ব্যাপ্তিও বিশাল। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বায়ুর চাপ ও তাপমাত্রা ভিন্ন হওয়ায় কার্বনকে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং চূড়ান্ত ধাপে তা হিরেতে পরিণত হয়।