• ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৮ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তথ্য জেনে ফেলাই কাল হয়েছিল মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের , হত্যার জন্য জঙ্গি ট্যাগ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ৩১, ২০২৬
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তথ্য জেনে ফেলাই কাল হয়েছিল মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের ,  হত্যার জন্য  জঙ্গি ট্যাগ ট্রাইব্যুনালে  অভিযোগ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততার তথ্য জানার কারণেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তাকে ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় গুম রেখে নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনায় সাবেক আইজিপিসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

স্বামীকে জঙ্গি বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে জেবুন্নাহারের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এই জঘন্যতম হত্যা ও গুমের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বৃহস্পতিবার এ মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

 

তৎকালীন সময়ে মিডিয়াতে যা প্রচার হয় : মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (যিনি ‘মেজর জাহিদ’ নামেও পরিচিত) ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা। ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার রূপনগরে পুলিশের এক অভিযানে তিনি নিহত হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তাত্ত্বিক নেতা ও সামরিক কমান্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তাঁর পরিবার দাবি করে যে তাঁকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের পিলখানায় পোস্টিং দেওয়া হয়। সেই তালিকায় মেজর জাহিদেরও নাম ছিল। তিনি এতে আগ্রহী ছিলেন না; তাই যোগদান করেননি। তখন পিলখানায় জাহিদের কোর্সমেট শহীদ ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দারের পোস্টিং ছিল। ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের ওপর এক মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ঘটনার দিন শহীদ ক্যাপ্টেন মাজহারুল জাহিদকে ফোনে বলেছিলেন, আমাদের সব অফিসারকে মেরে ফেলেছে।

কারা মেরেছে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মাজহার বলেন, কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তি, যারা বিডিআর-এর পোশাক পরা ছিল। যাদের কখনোই পিলখানায় আগে দেখিনি। মেজর জাহিদ তখন বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। ঘটনা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে ক্যান্টনমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। জাহিদ পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। তিনি মাজহারুলের কাছ থেকে অনেক কিছুই জেনে গিয়েছিলেন। তাই হাসিনা সরকার তাকে টার্গেট করে নজরদারিতে রাখত।

অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, সেনাবাহিনীতে অযোগ্য অফিসারের পদোন্নতি এবং নানা বিশৃঙ্খলা জাহিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি দেখলেন, চাটুকার ও অযোগ্য অফিসারদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে উত্তরায় ভাড়া বাসায় উঠেন।

‘মেজর’ জাহিদ ও তার স্ত্রী জেবুন্নেসা শিলা

জঙ্গি নাটক সাজিয়ে হত্যা : চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর গোয়েন্দারা জাহিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু হয়  অভিযোগ করেন জেবুন্নাহার। একপর্যায়ে পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জাহিদ। বাসা বদল করে উত্তরা থেকে রূপনগরে চলে যান। কিন্তু হাসিনা সরকার জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সেই মোতাবেক ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে জাহিদকে হাত বেঁধে বাসার নিচে নিয়ে যায় রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল। এরপর নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

এর আগে রাত ১০টার দিকে আসামিরা জেবুন্নাহারকে তার দুই শিশুসন্তানসহ চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তখন জেবুন্নাহার জানতে চান, তার স্বামী কোথায়? পুলিশ তখন বলতে থাকে, তিনি ও তার স্বামী জঙ্গি, এই স্বীকারোক্তি না দিলে তাকেও তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে পুলিশের কোনো একজন জানান, তারাই মেজর জাহিদকে হত্যা করেছে।

ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ ও  আসামি : গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর পৃথক অভিযোগ করেন জেবুন্নাহার। অভিযোগে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) তৎকালীন প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শাহীদ আলম, ডিসি ডিবি কৃষ্ণ পদ রায় ও রূপনগর থানা-পুলিশের তৎকালীন অজ্ঞাতনামা সদস্যদের আসামি করা হয়েছে।

প্রধান আসামি একেএম শহীদুল হককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দিয়েছেন।

স্ত্রীর ওপর নির্মম নির্যাতন: জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহারকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। নেওয়া হয় মিথ্যা জবানবন্দি। একই সঙ্গে নিহত মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং জেবুন্নাহারের বিরুদ্ধে ২টি সাজানো জঙ্গি মামলা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।

জেবুন্নাহার ইসলাম  বলেন, আমার স্বামী শহীদ মেজর জাহিদুল ইসলামকে হত্যার পর আমার ওপর নেমে আসে অমানবিক, নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম নির্যাতন। আসামিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার স্বামীকে জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন না হলে হয়তো আমাকে ধুঁকে ধুঁকে জেলখানায় মরতে হতো অথবা বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা হতো।

জেবুন্নাহারের ভাই জাহিদুল হক মজুমদার বলেন, জাহিদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দীর্ঘদিন পড়ে ছিল। লাশ নিতে চাইলেও পরিবারের কাছে দেওয়া হয়নি। আড়াই বছর পর বেওয়ারিশ হিসাবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করলে অনেক কষ্টে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

 

মিডিয়াতে যেমন প্রচার হয়  ,তৎকালীন মিডিয়া যেভাবে খবর প্রচার করেছিল : 

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশের দেবশিরভাগ মিডিয়াগুলোতে ‘রাজধানীর রূপনগর অভিযান, এক জঙ্গি নিহত ওসিসহ আহত ৩’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।  চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার (শীলা)। বলেছিলেন, আর দেখা না-ও হতে পারে। স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চার মাস পর গত শুক্রবার রাতে ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে গুলিতে নিহত হন পদাতিক বাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা। তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র বলছে, তারা তথ্য পেয়েছে, জাহিদুল তাঁর স্ত্রীকেও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁরা আইএস মতাদর্শে বিশ্বাসী নব্য জেএমবির অন্য অনেকের মতো ‘হিজরত’ করার কথা বলে গত এপ্রিলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন।

ওই সূত্র বলছে, তাদের কাছে তথ্য আছে জাহিদ উগ্রবাদে জড়িয়েছেন অন্তত আড়াই বছর আগে। এরপর গত বছর সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়েন। চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি তাঁর পরিচিতজনদের বলেছিলেন, চাকরির কারণে ঠিকভাবে তিনি ধর্ম-কর্ম করতে পারছেন না।

সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়ার পর ঢাকায় বেসরকারি স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। এ সময় তিনি দাড়ি রেখে পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরা শুরু করেন। জাহিদের মা-বাবা ও বোন জাহিদের এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন।
সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বাংলাদেশের একটি জাতীয় পত্রিকাকে বলেন, জাহিদের পুরো পরিচয় না পেলেও মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর (ছদ্মনাম) নামে জেএমবিতে যে একজন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর সক্রিয় আছেন, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, এমন তথ্য গত বছরের শেষ দিক থেকে পাওয়া যাচ্ছিল। গত বছর ঢাকায় শিয়াদের ধর্মীয় কেন্দ্র হোসেনি দালানে হামলার পর ধরা পড়া জঙ্গিদের কাছ থেকে এবং গত ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি শফিউল (পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত) কথিত মেজর মুরাদ সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল।

মিডিয়াতে শিরোনাম হয়েছিল : নিহত জঙ্গি মুরাদ ‘অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল’ (প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গি মুরাদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তার বাবা মো. নুরুল ইসলাম ছিলেন সাবেক পুলিশ পরিদর্শক। মা জেবুন্নাহার ইসলাম। বাড়ি কুমিল্লার সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়নের চাঁন্দপুর গ্রামে।

স্থানীয়রা জানান, গত রোজার সময় স্থানীয় মসজিদে জাহিদের বাবা বলেছিলেন, জাহিদ মেজরের চাকরি ছেড়ে কানাডা চলে গেছে। এলাকাবাসী মেজর মুরাদের ছবি দেখে সেই ছবি জাহিদের বলে শনাক্ত করেন। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে জাহিদের বাবার সঙ্গে একাধিবার যোগাযোগ করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাহিদরা দুই ভাই ও এক বোন। জাহিদ সবার বড়। তার স্ত্রীর নাম জেবুন্নাহার। তাদের দুই মেয়ে রয়েছে। জাহিদের পৈতৃক নিবাস সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। তবে জাহিদ জঙ্গি কাজে জড়িত কি-না তা এলাকাবাসী অবগত নন। সংবাদ মাধ্যমে তারা জাহিদ সম্পর্কে জেনেছেন। জাহিদ ৫/৬ মাস আগে একবার এলাকায় এসেছিলেন।

সূত্র জানায়, ১৯৮৫ সালের দিকে জাহিদের বাবা নুরুল ইসলাম চাঁন্দপুর এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করেন। তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনি ও তার স্ত্রী জামিলা ইসলাম থাকেন। প্রথম ও তৃতীয় তলা ভাড়া দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে নুরুল ইসলামের হার্টে রিং পরানো হয়। গত শুক্রবার তিনি চিকিৎসার জন্য স্ত্রীসহ ঢাকায় আসেন।

ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া আবদুল বারেক, জয়নাল আবেদীন ও তন্বী আক্তার জানান, তারা জাহিদকে এ বাড়িতে খুব কমই দেখেছেন।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরির্দশক (এসআই) শাহীন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জাহিদের পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে এখানে আসি, বাসায় ভাড়াটিয়া ছাড়া কেউ নেই। ছবি দেখে স্থানীয়রা জাহিদ বলে শনাক্ত করেছেন।

এলাকার ইউপি সদস্য মো. ইউনুস মিয়া বলেন, জাহিদকে আমরা চিনি না। তার বাবার সঙ্গে আমাদের পরিচয় রয়েছে। জঙ্গি কার্যক্রমে সে জড়িত ছিল কিনা তাও জানি না।

এদিকে নিহত ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, নিহত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে তার নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।

শনিবার দুপুরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিহত ব্যক্তির পরিচয় জানায়। পরিচয় অনুযায়ী তিনি মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। জাহিদুল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) ৪৩ লং কোর্সে প্রশিক্ষণ শেষে ২০০০ সালের নভেম্বরে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। গত বছরের মাঝামাঝি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাতে রূপনগরে অভিযানের পর সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, নিহত ব্যক্তি জেএমবির কথিত মেজর মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর।

পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবিতে তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছিলেন কথিত এই মুরাদ ওরফে মেজর মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর।

 

ঢাকায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চলছে: নিহত মেজর (অব:) জাহিদের স্ত্রীসহ দু’ নারীর আত্মসমপর্ণের দাবি পুলিশের ( ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বিবিসির প্রকাশিত খবর )

পুলিশ বলছে দক্ষিণখান এলাকার আশকোনার জঙ্গি আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসে দুই নারী আত্মসমর্পণ করেছে।তাদের সাথে দুটি শিশু রয়েছে ।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে দুজন আত্মসমর্পণ করেছে তাদের একজন নিহত মেজর (অব:) জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার, আরেকজন জঙ্গি মুসার স্ত্রী।

তিনি বলেন আত্মসমর্পণের সময় তারা একটি পিস্তল পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

মেজর (অব:) জাহিদ ঢাকার রূপনগরে পুলিশী অভিযানে নিহত হয়েছিলেন।

ওদিকে আত্মসমর্পণের পর দুই নারী ও শিশুদের তাদের ঘটনাস্থল থেকে মাইক্রোবাসে করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

ওদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন তিনতলা ভবনটির একটি ফ্লাটে নব্য জেএমবির বড় পর্যায়ের একজন নেতাও রয়েছেন।

ভবনটির অন্য ফ্লাটগুলোর বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে গত মধ্য রাত থেকেই অভিযান শুরু করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ব্রিফিংয়ে বলেছেন ওই বাড়িতে থাকা জঙ্গিরা নব্য জেএমবির সদস্য এবং তাদের কাছে শক্তিশালী গ্রেনেড রয়েছে।

পুলিশ বলছে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণের আহবান প্রত্যাখ্যান করছে কিন্তু তবুও চেষ্টা হচ্ছে যাতে তারা আত্মসমর্পণ করে।

ঘটনাস্থলে রয়েছে ঢাকার পুলিশ কমিশনারসহ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাবৃন্দ।

আশপাশের ভবনসহ সড়কগুলোতে ভিড় করেছে শত শত উৎসুক মানুষ।

এর আগে চলতি বছরেই নারায়ণগঞ্জ ও কল্যাণপুরে এ ধরণের অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গি নিহত হয়েছিলো।

 

স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হলো না মেজর জাহিদের স্ত্রী শিলার শিরোনামে যেমন খবর প্রচারিত হয় ২৫/১০/২০২২ তারিখে (ডিব্লিউ বাংলা )  : 

দুই মেয়েকে ঘিরে করেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা৷ সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে না করে মেয়েদের ঠিকমত মানুষ করবেন৷ তাই কুমিল্লা থেকে ঢাকায় চলে আসেন৷ মেয়েদের ভর্তি করেন ভাল একটি স্কুলে৷ বিভীষিকাময় অতীত ভুলে মা ও ভাইবোনদের সহযোগিতায় অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ান শিলা৷

কিন্তু উচ্চ আদালতের এক আদেশে তার সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়৷ হাইকোর্টের দেয়া জামিনের আদেশ সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বাতিল হয়ে যায়৷ তার আইনজীবী ফোনে তাকে এই খবরটি জানালে শিলা আদালতে আত্মসমর্পণ করে৷ আদালত তাকে আবার জেলে পাঠিয়ে দেয়৷

“যেহেতু আপির বিভাগ জামিন বাতিল করেছে তাই সহসা জেল থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই৷ এটা খুবই দুঃখজনক, তবে আদালতের আদেশ তো মানতেই হবে,” বলছিলেন নিম্ন আদালতে তার আইনজীবী নাজনীন আরা খাতুন৷

হাইকোর্টের একজন আইনজীবী বলেন, শিলার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক গুরুতর বিধায় আপিল বিভাগ তার জামিন বাতিল করে৷

তবে তার মতে, শিলার জামিন বাতিল একটি অনন্য ঘটনা৷ তিনি অনেকদিন জেল খেটেছেন৷ তাছাড়া তার দুই ছোট বাচ্চাও আছে৷ এসব বিবেচনা করেই হাইকোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করে ২০২০ সালে৷ কিন্তু জামিন আদেশের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করেছিল৷

এই আইনজীবীর মনে করেন, গত ৫/৬ বছরে প্রায় শতাধিক নারী জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ হাইকোর্টের জামিনে মুক্তি পেয়েছে৷

“অনেক নারী ও পুরুষ যাদের বিরুদ্ধে শিলার চেয়েও গুরুতর অভিযোগ আছে কিন্তু তারাও হাইকোর্ট থেকে জামিনে পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ অথচ শিলার জামিন বাতিল হল,” আক্ষেপ করে বলছিলেন তিনি৷

আশকোনায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় শিলা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন৷ পরবর্তীতে পুলিশ তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন৷ পুলিশের ভাষ্যমতে, অভিযানের এক পর্যায়ে শিলা কোমরে বাধা সুইসাইডাল ভেস্ট খুলে ফেলেন এবং আত্মসমর্পণ সময় একটি রিভলভার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন৷

“শিলা আর তার বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ আবার অনিশ্চিত হয়ে গেল৷ তার আর বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে আদালত জামিন বাতিল না করলেও পারতো,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিলার এক নিকট আত্মীয় ডয়েচে ভেলেকে জানান৷

হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, শিলা তো পালিয়ে যেতে চাননি৷ তিনি তার জীবনের বড় ভুল শুধরে বাচ্চাদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেয়েছিল৷ কিন্তু তাকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হল৷ রাষ্ট্রের উচিত যারা অতীতের ভুল ভুঝে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তাদের সুযোগ ও সহযোগিতা করা৷

শিলা জামিনে বের হওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তা দেখা করে যান তার ঢাকার বাসায়৷ সেনা ওই কর্মকর্তা ডয়েচে ভেলেকে জানান, এধরনের আসামীর পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অনেক কঠিন৷ তবে আমি তার মধ্যে এক ধরনের প্রত্যয় দেখেছি৷ একজন মা হিসেবে সন্তানদের মানুষ করার মাধ্যমে তিনি তার ভুলের প্রাসচিত্ত করতে চেয়েছিলেন৷

কুমিল্লার মেয়ে শিলা তার বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক ও পরিচিতদের কাছে একজন আধুনিক ও স্মার্ট মেয়ে হিসাবে পরিচিত ছিল৷ ২০০৬ সালে মেজর জাহিদের সাথে বিয়ের পরেও তিনি ও জাহিদ সাধারণ জীবন যাপন করছিলেন৷ দুজনের পরিবারও ছিল শিক্ষিত ও আধুনিক৷

২০১৪ সালে সব কিছু বদলে যায়৷ সে বছর জাহিদ এক প্রশিক্ষণে কানাডায় যাওয়ার পর সেখানকার এক মসজিদের ইমামের মাধ্যমে জঙ্গি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন৷ কানাডায় থেকেই জাহিদ ধর্মীয় বিষয়ে শিলাকে নির্দেশনা দেয়া শুরু করেন৷ নিয়মিত নামাজ ও পর্দা করার নির্দেশও দেন৷ ক্রমশ শিলা নিজেকে রূপান্তর করে ফেলেন৷

দেশে ফিরে জাহিদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিলাকে পুরোপুরি ধর্মীয় জীবনযাত্রায় মনোনিবেশ করতে বলেন৷ শিলা কখনও জাহিদের মতের বিরুদ্ধে যাননি৷ স্বামী যা বলেছেন তিনি সব মেনে নিয়েছিলেন৷