সিলেটের রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় এই ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মৃত আবরু মিয়ার ছেলে মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)। আব্দুস সাত্তার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ও সিলেট চেম্বারের পরিচালক ছিলেন।
দুর্বৃত্তরা বাসার ভেতর ঢুকে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে হত্যার পর পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করে পুলিশ। এলাকাবাসী জানান, সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না।
ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে নামে। সন্ধ্যায় রায়নগর কলোনি থেকে বাবুল নামে একজনকে আটক করে পুলিশ। তিনি রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির ভাড়াটিয়া, তার পিতার নাম নূর মিয়া ওরফে নূর কবিরাজ।
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় এবং বাসাটিতেও নিজস্ব ক্যামেরা রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ না থাকায় ওই সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সিসি ক্যামেরার বিষয়টি জেনেই দুবৃত্তরা লোডশেডিংয়ের সময়কে হত্যাকাণ্ডের জন্য বেছে নিয়ে থাকতে পারে।

জানা যায়, আব্দুস সাত্তারের গ্রামের বাড়ি বিয়ানীবাজার এলাকার আকাখাজনায়। চার যুগেরও বেশি সময় ধরে তারা রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন। এক সময় তিনি ব্যবসায়ী নেতাও ছিলেন। এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই আব্দুস সাত্তারের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এছাড়াও মিতালী আবাসিক এলাকায় তার পাশাপাশি তিনতলা দুটি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে ১১১ নম্বরের ৩য় তলাবিশিষ্ট নিজ বাসায় বসবাস করতেন তিনি। ওপরের তলা ও নিচতলায় ভাড়াটিয়ারা থাকতেন এবং তিনি দ্বিতীয় তলায় থাকেন। মো. আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে বাসায় বসবাস করতেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। দুই বিল্ডিংয়ের বাকি ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়াটিয়ারা থাকতেন। আব্দুস সাত্তারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ও দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন।
পাশের বাসার একজন জানান, ঘটনার দিন বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে মহানগরীর রায়নগর এলাকায় বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিং ছিল। প্রায় বাসার লোকজন ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে সাত্তার মিয়ার বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। তখন অনেকেই ধারণা করেন, সাত্তার মিয়া অসুস্থ থাকার জন্য হয়তো তিনি বিছানা থেকে পড়ে গেছেন। তাই কেউই গুরুত্ব দেননি। পরবর্তীতে উনার বাসার অন্য বাসিন্দারা আব্দুস সাত্তারের বাসার বারান্দাতে রক্ত দেখতে পান। এ সময় তারা চিৎকার করলে আশপাশের আরও লোকজন জড়ো হন। পরবর্তীতে থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে লাশ উদ্ধার করে।
পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা সচল ছিল না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে পুরো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

খুনের সাথে অভিযুক্ত রংমিস্ত্রী বাবুল মিয়া
এ নিয়ে সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিং করেন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি জানিয়েছেন- আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় ছিলো বাবুলের। সে বিভিন্ন সময় কাজের সুবাদে ওই বাসায় যাতায়াত করতো। কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।
গৃহকর্মীর সঙ্গে প্রেমের জেরে সিলেটের রংমিস্ত্রী বাবুল মিয়া একাই খুন করেছে তিন জনকে। নগরের রায়নগরে ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাবুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে খুনের ঘটনা স্বীকার করেছে।
প্রেস ব্রিফিং এ পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম তিনি জানান- সকালে বাবুল মিয়া ওই বাসায় যায়। দরোজা খুলে দেয় গৃহকর্মী তাহমিনা। এরপর বাবুল তাহমিনার রুমে গিয়ে কথা কাটাকাটি করে। এক পর্যায়ে বাবুল চাকু দিয়ে তাহমিনাকে খুন করে। চিৎকারে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকে খুন করা হয়। সর্বশেষ খুন করা হয় আব্দুস সাত্তারকে। গ্রেপ্তারকৃত বাবুল মিয়া রায়নগর এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত নূর মিয়া। বাবুল পেশায় রংমিস্ত্রি।
এদিকে একটি সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে; গৃহকর্মীর চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে যান। এরপর সুরাইয়া বেগমেরও চিৎকার শোনা যায়। পুলিশ জানায়- খুনের পর বাবুল বেলকোনি দিয়ে পালায়। পাশের ফ্ল্যাটের একটি স্থানে সে খুনে ব্যবহৃত ছুরি ফেলে দেয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, সিলেটে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও অপরাধের পেছনের মোটিভ বিশ্লেষণ করে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি বলেন, আসামির স্বীকারোক্তি ও দেখানো তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধারে একটি খালি প্লটে তল্লাশি চালানো হয়েছে। পালিয়ে যাওয়ার সময় আসামি ওই প্লটে ছুরিটি ফেলে যায় বলে জানা গেছে। তবে রাত হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। ছুরি উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তী তদন্তে ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত আশপাশ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো ছুরি বা অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। তদন্তের কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের তথ্যসহ সবকিছু বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার তাহমিনা
রায়নগর আবাসিক এলাকার যে বাসাটিতে হত্যার ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছে সেই বাসাতে কোরবানী ঈদের পরই কাজ শুরু করেছিলেন গৃহকর্মী তাহমিনা। দিনমজুর বাবার সংসারে একটু স্বস্তি আনতেই ওই বাসাতে কাজ শুরু করেছিল ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরী। তবে সংসারে স্বস্তির ফেরানোর আগেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়েছে তাহমিনাকে। গতকাল বুধবার ওই বৃদ্ধার মরদেহের সঙ্গে তার মরদেহটি পরে থাকতে দেখে পুলিশ। তার বুকে ও গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে।
তাহমিনার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক দোয়ারাবাজার এলাকায়। তার বাবা আপ্তাব মিয়া পেশায় একজন দিনমজুর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের পর তাহমিনা রায়নগরের ওই বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে আসে।
পরিবারের সঙ্গে সিলেট শহরের জল্লারপাড় এলাকার বাচ্চু মিয়ার কলোনিতে থাকত তাহমিনা। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের বড়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় অল্প বয়সেই কাজ শুরু করতে হয়েছিল তাকে। তাহমিনার মামা রাহিম মিয়া বলেন, কোরবানির ঈদের পর তাহমিনা ওই বাসায় কাজে যায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করত সে।
১২০ সিসি ক্যামেরাও, লোডশেডিংয়ে ‘অকেজো’
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালি আবাসিক এলাকা। নিরাপত্তাকর্মীসহ এই এলাকায় রয়েছে ১২০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিক্যামেরা)। এই ক্যামেরাগুলো প্রতিটি গলি ও মূলসড়কের নিরাপত্তার কাজে লাগানো হয়েছে। এমনকি এলাকার ক্যামরো ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকটি বাসাবাড়িতেও আলাদা করে ক্যামেরার সংযোগ রয়েছে। তবে এই হত্যাকান্ডের সময় লোডশেডিং থাকার কারণে অকার্যকর হয়ে গেছে এসব ক্যামেরা। কোনো ক্যামেরাতেই ধরা পড়েনি ওই বাসায় হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারো যাতায়াতের ফুটেজ। এতে করে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিস্ট ক্লু পেতে অনেকটাই বেগ পোহাতে হচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই হত্যাকান্ডটি একজনের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা। তবে বাসার ভেতরের সবগুলো ক্যামেরাতে আইপিএস সংযোগ ছিল না। একটি ক্যামেরাতে সেই সংযোগ ছিল। ওই ক্যামেরার ফুটেজ থেকে কিছুটা তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ফুটেজের আলোকেই পুলিশ ধীরে ধীরে তদন্তে এগুচ্ছে।