চলমান বিদ্যুৎ-সংকট বিবেচনায় দোকানপাট ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশে দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকসজ্জা, বাণিজ্যিক মেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান এই নির্দেশনার আওতাবহির্ভূত থাকবে।
আজ বুধবার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সারা দেশে এখন গড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং চলছে। এমন পরিস্থিতিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হলো। এত দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলার নিয়ম ছিল। এখন সেটা বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টায় এল।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১১ জুনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিষয় সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল। তবে আজ থেকে বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট ও দোকানসমূহ বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা, সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা ও সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়সীমা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ও অনুষ্ঠেয় মেলা বা বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান ইত্যাদি এর আওতাবহির্ভূত থাকবে।
সারা দেশে পাইপলাইনের গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট গতকাল বুধবার আবার বেড়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চুলা দিনের বেশির ভাগ সময়ই জ্বলছে না। রাজধানীসহ সারা দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হচ্ছে। শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেশি। গ্রামে ১০-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
সূত্র বলেছে, বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে দেশে গ্যাস-সংকট আবার তীব্র হয়েছে। গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিং বাড়ায় গতকাল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সারা দেশে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর আবেদন করেছে। সমিতি বিষয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছে।
সচিবালয়ে দুপুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের বলেন, সন্ধ্যা (বুধবার) থেকে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে জ্বালানিসংকট আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ও বৈরী আবহাওয়া। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মঙ্গলবারের তুলনায় গতকাল এলএনজি সরবরাহ আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে দৈনিক গড়ে ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। ফলে সঞ্চালন লাইনে সার্বিক সরবরাহ দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের চেয়েও কমে গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, লঘুচাপের কারণে সাগর উত্তাল হওয়ায় একটি এলএনজি টার্মিনালে এলএনজি কার্গো ভেড়ানো যাচ্ছে না। অপর টার্মিনালে কার্গো ভেড়ানো থাকলেও এর মজুত শেষ হয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে।
সূত্র জানায়, এই সংকটের মধ্যেও বিদ্যুতের উৎপাদনে জোর দিতে গিয়ে বাসাবাড়ি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও গ্রামাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বন্ধ রাখা হয়েছে। নোয়াখালী অঞ্চলে গতকাল ুপুর ১২টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে জেলার প্রায় ২৯ হাজার ৩৫০ জন গ্রাহক। বন্ধ রয়েছে সাতটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন।
বাখরাবাদ গ্যাসের নোয়াখালীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ব্যবস্থাপক নূর করিম জানান, এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে দুপুর ১২টা থেকে ফেনী গ্রিড থেকে প্রধান লাইনে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীর লক্ষ্মীনারায়ণপুরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম জানান, গত সপ্তাহে গ্যাসের সংকট থাকলেও বাসার চুলাগুলোতে কিছুটা জ্বলত। কিন্তু গতকাল দুপুর থেকে চুলা জ্বলছে না।
বেড়েছে লোডশেডিং
গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট প্রাক্কলন করা হলেও গত মঙ্গলবার রাত ৯টায় (ইভনিং পিক) তা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ওই সময়ে উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। গতকাল পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে। ফলে দিনে-রাতে গড়ে কমপক্ষে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট (২৫ থেকে ৩০ শতাংশ) বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল।
এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ সারা দেশেই। রাজধানীর অনেকে এলাকায় এক ঘণ্টা করে পাঁচ-ছয়বার, আবার কোথাও এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা করে দুই থেকে তিনবার লোডশেডিং হয়। কিন্তু জেলা, উপজেলা শহর এবং গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০-১৫ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে বিশেষ করে গ্রামে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা মিছিল করেছে।
এ অবস্থায় বিভিন্ন এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তা জোরদারে থানায় আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সারা দেশে তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করতে গতকাল আইজিপি বরাবর আবেদন করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও তারা বিষয়টি জানিয়েছে। আইজিপিকে দেওয়া সমিতির আবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানিসংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ কম হচ্ছে। ফলে সারা দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় অত্যধিক লোডশেডিংয়ের কারণে জনরোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র অফিসগুলো হামলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে আইজিপিকে অনুরোধ করা হয়েছে।