প্রলয়ের নেপথ্যে রয়েছে হিমালয় অঞ্চলের অন্যতম আতঙ্ক ‘জিএলওএফ’। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের বিধ্বংসী বন্যা কিংবা ২০২৫ সালের অগস্টে উত্তরকাশীর ঘটনার পর পুনরায় নেপাল সীমান্তে এই বিপর্যয় হিমালয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বরফ, পাথর, কাদা ও জলের বিধ্বংসী স্রোত (Nepal Flash Flood) নেমে এসে নিমেষে মুছে দিয়েছে একাধিক গ্রাম, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সেতু। প্রাকৃতিক এই ভয়াবহ তাণ্ডবে মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ শত শত মানুষ।
নেপাল সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন এই বন্যায় মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৭৩৪ ছাড়িয়ে গেছে। এখনও অন্তত ১,৫০০ মানুষ কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে বা জলের তোড়ে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।
পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই প্রলয়ের নেপথ্যে রয়েছে হিমালয় অঞ্চলের অন্যতম আতঙ্ক ‘জিএলওএফ’ (Glacial Lake Outburst Flood)। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের বিধ্বংসী বন্যা কিংবা ২০২৫ সালের অগস্টে উত্তরকাশীর ঘটনার পর পুনরায় নেপাল সীমান্তে এই বিপর্যয় হিমালয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
লিমনিক উদগিরণ বা গ্যাস বিস্ফোরণগভীর হ্রদের তলদেশে প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) বা বিষাক্ত গ্যাস হঠাৎ উপচে পড়ে এই মারাত্মক বিপর্যয় ঘটায়।কারণ: আগ্নেয়গিরির উত্তাপ বা ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা থেকে নির্গত গ্যাস হ্রদের ঠান্ডা ও গভীর পানির নিচে অতিরিক্ত চাপে দ্রবীভূত অবস্থায় জমে থাকে। ভূমিধস বা ভূমিকম্পের ফলে তলদেশের পানি ও ওপরের পানি মিশে গেলে সোডার বোতলের ছিপি খোলার মতো হঠাৎ সব গ্যাস উপরে উঠে আসে।
বহু বছর ধরে জমাট বাঁধা হিমবাহ যখন ধীরে ধীরে গলতে এবং পিছতে শুরু করে, তখন তা বিপুল পরিমাণ পাথর, বালি ও ধ্বংসাবশেষ বয়ে নিয়ে আসে। হিমবাহের শেষ প্রান্তে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো তৈরি হওয়া এই অংশকে বলা হয় ‘মোরেইন’ (Moraine)। মোরেইনের পিছনে হিমবাহের গলিত জল জমে প্রাকৃতিক হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেক তৈরি হয়। কোনও কারণে প্রাকৃতিক মোরেইন প্রাচীরটি ভেঙে গেলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো হ্রদের জল উপচে নীচে নেমে আসে। একেই বলে GLOF। এর ধ্বংসক্ষমতা শুধু জলের জন্য নয়; প্রবল গতিতে ধেয়ে আসা বিশালাকার পাথর, বরফখণ্ড ও কাদার স্রোতই নীচের নদী উপত্যকার সর্বাধিক ক্ষতি করে।
সাধারণত একাধিক উপাদানের ককটেলের প্রভাবে GLOF হয়। যেমন জলের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে প্রাকৃতিক বাঁধের তলা দিয়ে জল চুইয়ে প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশালাকার পাথর বা বরফের চাঁই আচমকা হ্রদে আছড়ে পড়লে জল উপচে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যায়। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টি সরাসরি হ্রদ না ভাঙলেও মোরেইনের মাটি আলগা করে দেয় এবং জলস্তর বাড়িয়ে দেয়। (উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালে সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদের মোরেইন ভেঙে যাওয়া এবং ২০২৫ সালে উত্তরকাশীর ক্ষীরগঙ্গায় তুষারধসের পর বৃষ্টিতে ধ্বংসাবশেষ ধেয়ে আসা)।
হিমালয় অঞ্চল কেন এত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের পর থেকে হিমালয়ের হিমবাহগুলি দ্রুত পাতলা ও সংকুচিত হচ্ছে। ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে দ্বিগুণ গতিতে বরফ গলছে। হিমবাহ যত পিছোচ্ছে, তত নতুন নতুন বিপজ্জনক হ্রদ তৈরি হচ্ছে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-র উপগ্রহ সমীক্ষা অনুযায়ী, হিমালয় অঞ্চলে ১০ হেক্টরের বড় প্রায় ২,৪৩১টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩০টি হ্রদ ভারতেই অবস্থিত। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তবে হিমালয়ের এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ পুরোপুরি গলে যাবে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি হওয়ার কারণ কী?
পাহাড়ের সরু নদী উপত্যকা ও নদীর প্রাকৃতিক গতিপথের একেবারে ওপর অপ্রতিরোধ্য হারে পরিকাঠামো নির্মাণ ও জনবসতি গড়ে ওঠাই এই বড় বিপর্যয়ের কারণ। হিন্দু কুশ হিমালয়ে প্রায় ৫০০ গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকায় বেশির ভাগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পই এই ঝুঁকিপূর্ণ উপত্যকাগুলিতে অবস্থিত। ২০২১ সালে ঋষিগঙ্গা হড়পা বানে ২২০ মেগাওয়াট ও ৫২০ মেগাওয়াটের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয় এবং ২০০-র বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের সিকিম বন্যায় ১২০০ মেগাওয়াটের তিস্তা-৩ প্রকল্প ধুয়েমুছে যায়। পাশাপাশি, নেচার (Nature) পত্রিকার গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে তৈরি হওয়া নতুন জনবসতির ৩৫% বন্যাকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তৈরি হচ্ছে।
প্রতিরোধ বা সুরক্ষার উপায় কী?
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৫০০ মিটার উঁচুতে দুর্গম স্থানে এই হ্রদগুলি অবস্থিত হওয়ায় কৃত্রিমভাবে জল নিষ্কাশন বা বাঁধ শক্ত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। তাই পরিবেশবিদদের মতে, প্রধান সমাধান হল ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা। বিপজ্জনক চিহ্নিত হ্রদগুলিতে সেন্সর ও ওয়েদার স্টেশন বসিয়ে নিয়মিত জলস্তর পর্যবেক্ষণ করা এবং নদী উপত্যকার প্রাকৃতিক প্লাবন অঞ্চলে সব ধরণের স্থায়ী নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাই সুরক্ষার একমাত্র পথ।
বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী কিছু হিমবাহ বিপর্যয়ের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১৯৪১ সালে উত্তর পেরুর আন্দিজ পর্বতে অবস্থিত একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। পানির তীব্র তোড়ে হুয়ারাজ শহরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনায় আনুমানিক ৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই দুর্যোগকে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৬২ সালে পেরুর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট হুয়াসকারান থেকে বিশালাকার বরফের চাঁই ভেঙে পড়ে। মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে ১ কোটি ঘনমিটার পাথর, বরফ ও তুষার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে। এতে করে রানরাহিরকা গ্রাম এবং আশপাশের কয়েকটি বসতি ১২ মিটার গভীর কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে। এই বিপর্যয়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মাউন্ট হুয়াসকারানের উত্তর দিকের প্রাচীর ভেঙে পড়ে। বরফ আর পাথরের বিশালাকার স্তূপ ঘণ্টায় ৩৩৫ কিলোমিটার গতিতে নিচের ইয়ুংগে ও রানরাহিরকা শহরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে করে পুরো এলাকা বিপুল পরিমাণ কাদার আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে যায়।
এই হিমবাহ ধসের কারণে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মারা যান। ভূমিকম্প ও বরফধস মিলিয়ে মোট প্রাণহানি সেই সময় ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
১৯৮১ — চিরেনমা কো, তিব্বত
১৯৮১ সালে চীন-নেপাল সীমান্ত থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে চিরেনমা কো নামের হিমবাহ হ্রদে পাহাড়ের বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে পড়ে। হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিশাল ঢেউ সৃষ্টি হয়। প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ তীব্র বেগে নেপালের দিকে ধেয়ে আসে। এই দুর্যোগে নেপালে আনুমানিক ২০০ মানুষ নিহত হন। সেতু, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে প্রায় ৪০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নন্দা দেবীর কাছে রন্টি পিক থেকে বরফের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে। পাথর, ধুলাবালি ও বরফের বিধ্বংসী স্রোত উপত্যকার দেড় হাজার মিটার নিচে নেমে আসে। উত্তরাখণ্ড রাজ্যে তৈরি হওয়া আকস্মিক বন্যায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। বহু গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায় এবং দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পানির তোড়ে ভেসে যায়।
২০২৬ — নেপাল-তিব্বত সীমান্ত
বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয়ের একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে। এতে নেপাল ও তিব্বতজুড়ে এখ পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। কাদামাটির তীব্র স্রোত তিব্বতের গিরোং বন্দরে আঘাত হানে এবং পরে তা নেপালের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায় এবং পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।