• ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী মাঝির সাক্ষ্য : গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে লাশ ফেলতেন জিয়াউল আহসান

Usbnews.
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী মাঝির সাক্ষ্য :  গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে লাশ ফেলতেন জিয়াউল আহসান
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক জানিয়েছেন, জিয়াউল আহসান মাঝরাতে বন্দি নিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন চরদুয়ানি বাজারে আসতেন। বন্দিদের গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেয়া হতো। অনেক বন্দিকে সুন্দরবনে গুলি করে হত্যা করা হতো, পরে সাংবাদিক ডেকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজানো হতো।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলাটির দশম সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি জানান, কীভাবে ২০১০ এবং ২০১১ সালে র‍্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান বন্দিদের গুলি করে হত্যা করতেন এবং লাশ গুম করতে পেট কেটে ও সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দিতেন।

পলাতক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চর দুয়ানীর বাসিন্দা মো. আব্বাস মল্লিক।

পেশায় জেলে আব্বাস মল্লিক বলেছেন, চর দুয়ানী দিয়ে বলেশ্বর নদে যেতেন এবং সেখান থেকে এক দেড় ঘণ্টা ট্রলার বা নৌকা চালিয়ে গভীরে যেতেন। নদের গভীরে যাওয়ার পর নৌকা বা ট্রলারের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বন্দীদের বের করে আনা হতো। ট্রলার/বোটের দুই পাশে সাপোর্ট নামক একটি অংশ থাকে। একজন বন্দীকে বের করার পর দুজন র‍্যাব সদস্য তাঁকে সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান ওই বন্দীর মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন। এরপর ওই মৃত বন্দীর গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ নদে ফেলে দেওয়া হতো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আজ বুধবার এই জবানবন্দি দেন সাক্ষী আব্বাস মল্লিক। এই মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান। তিনি গ্রেপ্তার আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

নৌকা বা ট্রলার অভিযান পরিচালনার জন্য দিতে হবে

জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, ২০১০ সালে র‍্যাব চর দুয়ানী ও কাঁঠালতলীতে আসা-যাওয়া করত। র‍্যাব সদস্যরা নৌকার মালিকদের ডেকে বলেন, নৌকা বা ট্রলার অভিযান পরিচালনার জন্য দিতে হবে। যেদিন তাঁদের এলাকায় র‌্যাবের অভিযান থাকত, সেদিন বিকেলে সাদাপোশাকে দুজন র‍্যাব সদস্য তাঁদের এলাকায় আসতেন। দোকানের মালিকদের ডেকে বলতেন সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ থাকবে এবং দোকানের বাতি নিভিয়ে রাখতে হবে। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‍্যাবের ৪ থেকে ৫টি মাইক্রো আসত। গাড়িগুলো বরফ মিলের সামনে থামত। এরপর গাড়ি থেকে বন্দীদের নৌকায় নিয়ে তুলতেন।

বন্দীদের ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হতো উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, বন্দীদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। বন্দীদের নৌকায় ওঠানোর পর রিয়াজের দোকান থেকে সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা নেওয়া হতো তাঁদের সঙ্গে। এরপর তাঁদের নৌকা চালাতে বলা হতো। এরপর চর দুয়ানী দিয়ে বলেশ্বর নদে যেতেন।

মাঝরাতে বন্দি নিয়ে আসত র‍্যাব

সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক জানান, যেদিন এলাকায় অভিযান হতো, সেদিন বিকালে সাদা পোশাকে দুইজন র‍্যাব সদস্য এসে স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ রাখতে এবং বাতি নিভিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিতেন। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‍্যাবের ৪ খেকে ৫টি মাইক্রোবাস বরফ মিলের সামনে এসে থামত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের নিয়ে এসে ট্রলারে তোলা হতো। বোট ছাড়ার সময় র‍্যাব সদস্যরা সঙ্গে করে রশি ও সিমেন্টের বস্তা নিতেন।

আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দি অনুযায়ী, বন্দিদের নিয়ে ট্রলারটি বলেশ্বর নদী হয়ে গভীর পানির দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। গভীর পানিতে যাওয়ার পর ট্রলারের গতি কমিয়ে দেয়া হতো এবং ট্রলারের ভেতর থেকে চোখ-হাত বাঁধা বন্দিদের বের করে আনা হতো। ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্ট নামের অংশে বন্দিকে দুইজন র‍্যাব সদস্য চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে এসে ওই বন্দির মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন।

পেট চিরে ও বস্তা বেঁধে নদীতে লাশ গুম

গুলির পর মৃতদেহের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হতো। লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য লাশ নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে ফেলা হতো। এরপর সুন্দরবনে নিয়ে অন্য বন্দিদের বোট থেকে নামিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো এবং সাংবাদিকদের ডেকে থানায় লাশ হস্তান্তর করা হতো।

হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে আসার পর মাঝিদের খামে করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হতো বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন আব্বাস মল্লিক।

পরে র‍্যাব সাংবাদিকদের ফোন দিয়ে ডেকে আনত উল্লেখ করে আব্বাস মল্লিক বলেন, এরপর বিভিন্ন থানায় লাশগুলো জমা দিত। নৌকাগুলো ধুয়ে তাঁরা চর দুয়ানীতে আসতেন। নৌকা ধোয়ার প্রয়োজন হতো এই কারণে যে বন্দীদের পেট কেটে ফেলা হতো। এর ফলে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসত। মগজ বের হয়ে আসত এবং বন্দীদের শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো। এরপর তাঁরা সুন্দরবন থেকে চর দুয়ানী বরফমিলে ফিরে যেতেন। পরে মেজর সাব্বির বলতেন, ‘তোমাদেরকে জিয়া স্যার ডাকে।’ তাঁরা মাঝিরা জিয়াউলের কাছে যেতেন। জিয়াউলের কাছে গেলে তাঁদের (সাক্ষীসহ অন্য মাঝি) প্রত্যেককে কখনো দুই হাজার, কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। টাকাগুলো খামে করে দেওয়া হতো। তাঁর ছোট ভাই আলকাছ র‍্যাবের সঙ্গেই কাজ করতেন।

নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ

প্রত্যক্ষদর্শী এই মাঝি ট্রাইব্যুনালে তার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু র‍্যাবের এই বর্বর কর্মকাণ্ডের কথা আলকাছ বাজারে আলোচনা করায় স্থানীয় অন্য বোটের মালিকরা তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, র‍্যাব তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।

পরে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন আলকাছ, কারণ র‍্যাব থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়েছিল যে, ‘জিয়া স্যার’ তাকে বটতলা মানিকখালীতে ডেকেছেন। ওইদিন সন্ধ্যা থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং আজ পর্যন্ত তার আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

আব্বাস মল্লিক বলেন, তাঁর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক নিখোঁজ। আলকাছ মাঝেমধ্যে তাঁদের সঙ্গে নদে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝেমধ্যে দোকানে বসতেন। মুদির দোকান করতেন। যে নৌকায় করে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন, এর মালিক ছিলেন তাঁর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক। আলকাছ কিছু লেখাপড়া জনতেন। ২৫-২৬ বছর আগে সৌদি আরব যান। সেখানে ছয় থেকে সাত বছর কাজ করে আবার চর দুয়ানী ফিরে আসেন আলকাছ। ফিরে এসে চর দুয়ানীতে দুটি মাছ ধরার ট্রলার/বোট তৈরি করেন। একটার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয় এবং অপরটির দায়িত্ব জলিল মাঝিকে দেওয়া হয়। তাঁরা নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আলকাছ মল্লিকও তাঁদের সঙ্গে যেতেন।

২০১১ সালের মাঝামাঝি র‍্যাব থেকে আলকাছ মাঝিকে ফোন দিয়ে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে’ উল্লেখ করে আব্বাস মল্লিক বলেন, র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলকাছ মাঝি বাজারে আলোচনা করতেন। তখন অন্য বোটের মালিকেরা আলকাছকে বলতেন, র‍্যাব তোমার ওপর খুব খ্যাপা। ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‍্যাবের পরিচয় দিয়ে আলকছাকে ফোন করা হলে সেদিনেই আলকাছ দুপুরে ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওই দিন সন্ধ্যায় আলকাছের স্ত্রী তাঁকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘মাইজা ভাই, আলকাছ র‍্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সাথে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছে, এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।’ এরপর আর পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল এবং ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়ে ঘুরেও ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি আব্বাস মল্লিক। পাথরঘাটা থানায় জিডি করতে গেলেও পুলিশ সেখানে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে সাক্ষ্যে উঠে আসে।

সাক্ষ্যের শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে সরাসরি শনাক্ত করে আব্বাস মল্লিক ট্রাইব্যুনালের কাছে তার ছোট ভাই নিখোঁজের বিচার দাবি করেন।