রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নিহত গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করা হলেও এখনো গ্রেপ্তার আসামিদের নমুনা নেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী।
সিআইডি ও তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টি আলামত সংগ্রহ করে সিআইডি। ঘটনার ১২ দিন পর তিন দফায় এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আলামতের মধ্যে রয়েছে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নান রুটি, শসা ও খেজুর, বেসিনের দাগ এবং নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখা।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, গত দুই দিনে তিন দফায় সিআইডি থেকে পাওয়া সব আলামত আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে কারাগারে থাকা আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আসামিদের নমুনা দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত কেন দ্রুত ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেখেছে সিআইডি। আসামিদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হবে। ডিএনএ মিললে হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সম্পৃক্ততার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
সিআইডির রংপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন সিআইডির বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা পরিদর্শক মিল্লাতের নেতৃত্বে ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টিরও বেশি আলামত সংগ্রহ করেন। পরে সব আলামত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকার প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হত্যার আগে-পরে ৮০ বার ফোনালাপ হয় আসামিদের
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনাটি ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ৮০ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস মোট ৮০ বার পরস্পরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঘটনার আগের ও পরের সময় মিলিয়ে দুই আসামির মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে একবার করে ফোনালাপের প্রমাণ মিলেছে, যা স্বাভাবিক নয়। এই অস্বাভাবিক যোগাযোগের কারণেই পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে তদন্তকারীদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস সম্পর্কে চাচাতো ভাই।

নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যরা। ফাইল ছবি
এদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে বাড়ির ছাদে বসে নয়টি ইয়াবা সেবনের স্বীকারোক্তি দিলেও ডোপ টেস্টে আসামিদের শরীরে কোনো মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সনাতন চক্রবর্তী জানান, আদালতের নির্দেশে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে আসামিদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়। তবে পরীক্ষার প্রতিবেদনে তাদের শরীরে কোনো মাদক শনাক্ত হয়নি। এ বিষয়ে চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইয়াবায় থাকা অ্যামফিটামিন বা মেথামফেটামিনজাতীয় উপাদান মানবদেহে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আর পরীক্ষায় ধরা পড়ে না।
অন্যদিকে মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তবে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিচারক রিমান্ড নামঞ্জুর করেন। সোমবার বিকেলে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম আসামিদের দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।
গত ২২ আগস্ট মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার থানা থেকে মহানগর ডিবিতে হস্তান্তর করা হয় এবং ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
‘ডোপ টেস্টের দেরিতে’ আসামিদের শরীরে মেলেনি মাদক

রংপুরের আলোচিত চার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন এবং গ্রেপ্তারের আট দিন পর তাদের নমুনা সংগ্রহ করায় মাদক শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
রোববার (৩০ আগস্ট) ডোপ টেস্টের জন্য মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
ডোপ টেস্টের রিপোর্টের বিষয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হক বলেন, এমফিটামিন অনেকদিন পর্যন্ত রক্তে বা মূত্রে থাকে না, প্রস্রাবে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন থাকে, এরপরে আর পাওয়া যায় না। যেহেতু তারা সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক অবস্থায় আছে, তাই মাদক গ্রহণ করতে পারে নি। সাত দিনের বেশি হলে এমফিটামিনের উপস্থিতি প্রস্রাবের ভেতরে পাওয়া যায় না।
এদিকে ডোপ টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহে দেরি হওয়ার জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়াসহ প্রক্রিয়াগত জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন সনাতন চক্রবর্তী।
একদিন পর আজ সোমবার রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘গতকাল জেলগেট থেকে দুই আসামির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ওই নমুনা পরীক্ষা করে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।’
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রথমে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আমরা তাদের ডোপ টেস্ট করাব কিনা। এরপর আমরা আদালতে আবেদন করেছি। আদালত সেটা বিবেচনা করেছেন, এরপর আদালত আদেশ দিয়েছেন। সেই আদেশটি আমরা পেয়েছি বৃহস্পতিবার। এরপর দুই দিন ছুটি ছিল। তারপর প্রথম ওয়ার্কিং ডে তেই আমরা এটা (ডোপ টেস্ট) করেছি।’
এদিকে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। তবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়া, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম এ আদেশ দেন।
পরে সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পরও বেশ কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পর অধিকতর তদন্তের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল।
তিনি জানান, আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়নি। তবে তাদের পক্ষে লিগ্যাল এইডের আইনজীবীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানিতে যুক্ত ছিলেন। শুনানি শেষে আদালত দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।
এর আগে গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রংপুরে চার হত্যা মামলায় সিদ্ধার্থ-মুগ্ধকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দুই দিন তাদের তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে পুলিশ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রংপুর মেট্রোপলিটন চিফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রফিকুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুই আসামির তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তবে তারা ইতোমধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেওয়ায় আইনগত কারণে রিমান্ডের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তদন্তে পাওয়া নতুন কিছু তথ্য যাচাই এবং আগের তথ্যের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। শুনানিতে বিচারক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পুলিশের বক্তব্য ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। পরে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।