বিরোধী দলকে সভাপতি পদ না দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সব সংসদীয় কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার চারটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি ও বিষয়ভিত্তিক ১১টি কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দল থেকে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংখ্যানুপাতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ না দেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে বিরোধী দল। অন্য দিকে একাধিক কমিটিতে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগীদের (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও হুইপ) কমিটির সভাপতি করায় স্পিকার উষ্মা প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনার জন্য রুলিং দিয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার শেষ দিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া এ দিন ছয়টি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। চিফ হুইপ পৃথক পৃথকভাবে কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
আজ গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষার সভাপতি করা হয়েছে নরসিংদী-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিনকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সরকারদলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে শরীয়তপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) সাঈদ আহমেদকে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে।
কমিটি গঠন শেষে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যবণ্টন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তাঁদের অভিযোগ, বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী সদস্যদের বিভিন্ন কমিটিতে রাখা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে দুজন করে সদস্য দেওয়া হলেও তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে চারজন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। কোনো মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদও বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
আলোচনার সূত্রপাত করেন রংপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি মো. রায়হান সিরাজী। তিনি বলেন, কমিটি পুনর্গঠনের সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বারবার বলেছেন, সদস্যদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ আগে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে থাকা রায়হানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে রাখা হয়েছে।
রায়হান বলেন, ‘এখানেও কোনো সদস্যের পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়বিষয়ক এই কমিটিতে আমার নাম ছিল না। কৃষি মন্ত্রণালয়বিষয়ক কমিটিতে আমার নাম ছিল। যদি কোনো সদস্যের নাম পরিবর্তন না হয়, তাহলে আমি তিস্তাপাড় থেকে কীভাবে পাহাড়ে গেলাম?’ এটি ‘প্রিন্টিং মিস্টেক’ কি না, তা পরীক্ষা করার অনুরোধ করেন তিনি।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, বিষয়টি তিনি পরীক্ষা করবেন। তিনি বলেন, ‘এটা প্রিন্টিং মিস্টেক কি না, আমি দেখে, যদি দরকার হয়, পরবর্তী সময়ে জানাব। যদি সংশোধন লাগে, সংশোধন নিয়ে আসব।’
এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতেও সদস্য পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দল আগে থেকে যে তালিকা দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী সব সদস্যকে কমিটিতে রাখা হয়নি।
নাহিদ বলেন, ১০ সদস্যের প্রতিটি কমিটিতে বিরোধী দল প্রথমে তিনজন করে সদস্য চেয়েছিল। পরে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিরোধী দল মোট সদস্যের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব পাবে। সে হিসাবে কিছু কমিটিতে তিনজন ও কিছু কমিটিতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য রাখার কথা ছিল; কিন্তু সেটিও ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ আরও বলেন, ‘আমরা যেভাবে তালিকাটা দিয়েছিলাম যে, এই মন্ত্রণালয়ে বিরোধী দলের তিনজন, এই মন্ত্রণালয়ে দুজন, সেখানে ডিস্টরশন করা হয়েছে। কয়েকটা মন্ত্রণালয়ে নামগুলো সেভাবে আসেনি। অনেকগুলো জায়গায় ভুল এসেছে।’ তাঁর অভিযোগ, কোথাও দুজন, কোথাও তিনজন ও একটি কমিটিতে বিরোধী দলের চারজন সদস্য রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই অধিবেশনের মধ্যেই সব সংসদীয় কমিটি গঠন শেষ করার তাড়াহুড়োর কারণে এমন ভুল হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী অধিবেশনে এসব কমিটি সংশোধনের দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘স্থায়ী কমিটিগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর হোক। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাই।’ কমিটিগুলো ‘ইচ্ছেমতো’ গঠন করা হলে বিরোধী দলের পক্ষে তাতে অংশ নেওয়া কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব হিসাব করেই সদস্য দেওয়া হয়েছে। তাঁর হিসাবে, ১৯টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে ও অন্য কমিটিগুলোতে দুজন করে সদস্য থাকার কথা।
আরও ৫ সংসদীয় কমিটি গঠন, এবারও সভাপতি পেল না বিরোধী দলআরও ৫ সংসদীয় কমিটি গঠন, এবারও সভাপতি পেল না বিরোধী দল
তবে নাহিদ বলেন, এরচেয়ে বেশি, ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। চিফ হুইপ বলেন, ‘আমি সেখানে হিসাব করে ২২টা কমিটিতে তিনজন করে দিয়েছি।’