• ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

১৫৩ অনুচ্ছেদে খুঁজলে ক্রান্তিকালীন সরকারের বৈধতা মিলবে না

Usbnews.
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
১৫৩ অনুচ্ছেদে খুঁজলে ক্রান্তিকালীন সরকারের বৈধতা মিলবে না
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী ক্রান্তিকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা কেবল বিদ্যমান সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদের আক্ষরিক ব্যাখ্যার মধ্যে মিলবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট  মোহাম্মদ শিশির মনির।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে বর্তমান সাংবিধানিক সংকট ও উত্তরণের রূপরেখা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

শিশির মনির বলেন , বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সংবিধানের ধারা ও উপধারার আক্ষরিক পাঠ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে আইনি বিভ্রান্তি তৈরি হবে। সংবিধানকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে এর ঐতিহাসিক পটভূমি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সুপ্রিম কোর্টের অতীতের বিভিন্ন রায় এবং আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক আইনের বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য।

পরিস্থিতি উত্তরণে সংবিধান ও সাংবিধানিক আইন, সংশোধন বনাম সংস্কার, গণভোট ও ভিন্নমতের মর্যাদা, ক্রান্তিকালীন সময় এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের আলোকে আইনি অবস্থান—এই পাঁচটি মৌলিক দিক তুলে ধরেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় আংশিক কোনো ‘সংশোধন’ নয়, বরং প্রয়োজন কাঠামোগত ‘সংস্কার’। জুলাই সনদের মূল চেতনাও এই সংস্কারের পক্ষে। বিদ্যমান সাংবিধানিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক রূপান্তরের আইনি ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে হলে জনগণের অবিভাজ্য ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ বা ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’-এর ওপরই নির্ভর করতে হবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ পরিবর্তন করা যায় না। প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পরিবর্তন শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে করা আইনত সম্ভব নয়।

সংস্কার বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ২৬৬ বিধির উদ্ধৃতি দিয়ে শিশির মনির জানান, এই বিধির অধীনে একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠনে কোনো আইনগত বাধা নেই। এছাড়া সংস্কারের চূড়ান্ত বৈধতায় গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রতিষ্ঠা কিংবা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিলে, কোনো রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত সেই গণম্যান্ডেটের বিকল্প হতে পারে না। জনগণের সরাসরি দেওয়া রায়ের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া সার্বিক গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আক্ষরিক পাঠে সংবিধানের ‘অপব্যাখ্যা’

সংবিধানের কেবল আক্ষরিক পাঠ দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করাকে ‘ভুল ব্যাখ্যা’ (মিসইন্টারপ্রিটেশন) আখ্যা দিয়ে শিশির মনির বলেন, আমাদের সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, একটি প্রস্তাবনা ও তফসিল আছে। যারা আক্ষরিক অর্থে পড়তে চান, তারা কেবল এতটুকুই দেখবেন। কিন্তু সংবিধান বুঝতে গেলে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সুপ্রিম কোর্টের অতীত রায় ও স্কলারদের মতামত সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যারা কেবল ‘ক’ আর ‘খ’-তে কী লেখা আছে তা পড়ে সংবিধান বিশ্লেষণ করছেন, তারা সাংবিধানিক আইন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। ‘সংশোধন’ নয়, করতে হবে ‘সংস্কার’।

সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য সংস্কার হলেও পদ্ধতি হিসেবে সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধির অধীনে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিধি অনুযায়ী সংস্কারের উদ্দেশ্যে কমিটি গঠনে আইনগত কোনো বাধা নেই। ২৬৬ বিধিতে কমিটির নাম বলা হয়েছে ‘বিশেষ কমিটি’, এটি কেবল সংশোধনের জন্যই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বা মৌলিক কাঠামো— যেমন প্রস্তাবনা বা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তন করা যায় না। অতীতে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাস হলেও তা টেকেনি। কারণ এগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি ছিল। এগুলো পরিবর্তন করতে হলে ‘অ্যামেন্ডিং পাওয়ার’ নয়, ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’ বা গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।

গণভোটের রায় বনাম ভিন্নমত

গণভোটের প্রশ্নে জনগণের মতামতের ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন গঠন, উচ্চকক্ষ (দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ) প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে জনগণের ‘হ্যাঁ’ ভোট থাকলে সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের ‘ডিসেন্টিং অপিনিয়ন’ বা ভিন্নমত কার্যকর হতে পারে না।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, গণভোট বড়, নাকি ভিন্নমত বড়? জনগণকে জিজ্ঞাসা করার পর তারা যখন ম্যান্ডেট দিয়েছে, তখন আপনি যদি ভিন্নমত নিতে চান, তবে তা হবে জনগণের ম্যান্ডেটের লঙ্ঘন।

ক্রান্তিকালের বৈধতা ও জনগণের ‘গাঠনিক ক্ষমতা’

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালকে ‘সাংবিধানিক ভেকুয়াম’ বা শূন্যতা হিসেবে উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, এই সময়ের বৈধতা সংবিধানে খোঁজা বৃথা।

তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট সরকার শূন্য হয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশ কোন আইনে চলছে— এই উত্তর সংবিধানে পাবেন না, সাংবিধানিক আইনে পাবেন। এর নাম হলো ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’ বা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা। এই ক্ষমতা ১৫৩ অনুচ্ছেদে লেখা নেই।

১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সরকারপ্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত এবং সুপ্রিম কোর্টের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, একবার সংবিধান বানিয়ে ফেললেই নতুন করে সংবিধান বানানোর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায় না। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট একে ‘রিপোজিটরি অব কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’ বলেছে, যা সবসময় জনগণের কাছে থাকে। ৫ আগস্ট ঠিক সেটাই ঘটেছে।

বক্তব্যের শেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ক্রান্তিকালের ব্যাখ্যা কেবল জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করলেই দেওয়া সম্ভব। তা না করে কেবল সংবিধানের পাতায় খুঁজলে, বিগত এই দেড় বছরকে ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর তা করলে পরবর্তী সরকারের অবস্থান কী দাঁড়াবে, সেটি ভেবে দেখতে হবে।