পৃথিবী একটি সম্পূর্ণ সাগরকে অদৃশ্য হতে দেখেছিল। এর নাম ছিল আরাল সাগর। কাজাখস্তান এবং উজবেকিস্তানের মধ্যে অবস্থিত এই সাগর ২০১০ সালের মধ্যে শুকিয়ে গিয়েছিল।
নাসা প্রকাশিত উপগ্রহ ২০০৮ সালে দ্বিতীয় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পুনরায় উত্তর আরাল সাগরে পানি প্রবাহ শুরু হয়। কাজাখস্তান বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি পুনরায় আনতে সক্ষম হলেও, গবেষকদের মতে, আর কখনোই আরাল সাগরের পানি সম্পূর্ণরূপে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না। আরাল সাগর বিপর্যয়কে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরা হয়।চিত্রে দেখা যায়, এর পূর্বাঞ্চলীয় দিকটি পুরোটা শুকিয়ে গেছে। এই অঞ্চলটি এখন কারাকুম মরুভূমি নামে পরিচিত। আরল সাগর বিপর্যয়কে গত শতাব্দীর মানুষ সৃষ্ট সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
আন্তর্জাতিক সাগর গবেষকদের নিবন্ধে দেখা যায়, ১৯৬০ সালের দিকে আরাল সাগর পৃথিবীর বুকে চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে আরাল সাগরের বয়স প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন বছর। এই সাগরের জলরাশি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত ছিল। উত্তর থেকে সির দরিয়া ও দক্ষিণ থেকে আমু দরিয়া নদী থেকে পানি এসে মিশত আরালের বুকে। ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৬৭ হাজার বর্গ কিমি আয়তনের হ্রদটির প্রায় ৭০ শতাংশ শুকিয়ে গেছে। আর এই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আরাল সাগরের শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্তমান পৃথিবীর জন্য এক অশনিবার্তা।
কাজাখ সরকার বসে না থেকে নিজস্ব অর্থায়নে কাজাখস্তান সীমানায় বাঁধ নির্মাণ শুরু করার নির্দেশ দেন। ২০০৫ সালের দিকে বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়। বাঁধের কারণে কাজাখ অঞ্চলে আরাল সাগরের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়। হ্রদে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং উত্তর আরাল সাগরে মাছ চাষ শুরু হয়।

কাজাখস্তানের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে উজবেকিস্তানের বিজ্ঞানীরাও এগিয়ে আসেন। কিন্তু পানির অধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় কেউই সমঝোতায় আসতে না পারায় এই প্রকল্প বেশিদূর এগোয়নি।
জড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাংক
পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক এই কাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। কাজাখ সরকারকে ৬৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করা ছাড়াও প্রায় ৮৬ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নেয় বিশ্বব্যাংক। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পুনরায় উত্তর আরাল সাগরে পানি প্রবাহ শুরু হয়।একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল সায়েন্স জার্নালে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেছে। হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এবং মানব ক্রিয়াকলাপকে দায়ী করেছে।
রাসায়নিক বর্জ্য, বিষাক্ত কীটনাশক
আরালের মাছ ধরে অনেক অধিবাসী জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু, ১৯৬০-৭০-এর দিকে বিশাল হ্রদের পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে। এরপর ১৯৮০ সালে আমু দরিয়া নদীতে বাঁধ দেয়া হয়। ১৯৮৭ সালে হ্রদের পানি শুকিয়ে দুই ভাগ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে ৯০ শতাংশ পানি শুকিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে আবহাওয়ায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে। ঝড়-তুফানের পরিমাণ বেড়ে যায় বহুগুণে। এ ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাগারের রাসায়নিক বর্জ্য, বিষাক্ত কীটনাশক, শিল্পকারখানার বর্জ্য আরাল সাগরের পানিতে নিষ্কাশন করা হতো। পরবর্তী সময়ে আরালের অধিবাসীরা উপায় না দেখে অন্য প্রদেশে চলে যেতে থাকেন।

১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই কমতে শুরু করে সাগরের পানি। সোভিয়েত সেচ প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে কমতে থাকে আরাল সাগরের পানি। মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই আরাল সাগরের শুকিয়ে যাওয়া, কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। পরিবেশ ধ্বংসের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ এটি। এই সাগরকে একসময় গড়ে উঠেছিল জনজীবন। ৬৮,০০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত আরাল সাগর এখন সম্পূর্ণরূপে পৃথিবীর চোখের আড়ালেই চলে গিয়েছে। শুধুমাত্র একটি নির্জন ল্যান্ডস্কেপ রেখে গিয়েছে এটি।
কেন শুকিয়ে গেল আরাল সাগরের পানি?
সাগরটি শুকিয়ে যাওয়ার পেছনের মূল খলনায়ক তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৮ সালে গড়ে তোলা সোভিয়েত তুলা শিল্প তখন সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছিলো। সোভিয়েত সরকার তাই বিশ্ব বাজার ধরে রাখতে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করার প্রকল্প হাতে নেয়।১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে করা জরিপ অনুযায়ী আরাল সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ এক সময়ের বিশাল আরাল সাগর সামান্য জলাশয়ে পরিণত হয়।বর্তমানে আরাল সাগরকে মৃত বললে কোন অংশে ভুল হবে না। এই হ্রদটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আশেপাশের প্রকৃতি এবং মানব জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

নাসার আর্থ অবজারভেটরি আরাল সাগরের অদৃশ্য হওয়ার কারণ সম্পর্কে একটি বিশদ বিশ্লেষণ পোস্ট করেছে। ১৯৬০-এর দশকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেচের উদ্দেশ্যে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের শুষ্ক মরুভূমিতে একটি বড় সেচ প্রকল্প শুরু করে। মূলত শুষ্ক অঞ্চলে তুলো সহ অন্যান্য ফসল চাষের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক এই বৃহৎ সেচ পরিকল্পনাই আরালের জল শুকিয়ে যাওয়ার আসল কারণ, বলে দাবি করেছে নাসার আর্থ অবজারভেটরি।

Caption & Image Courtesy Luca Pietranera, Telespazio, Rome, Italy, based on data from the MODIS Science Team
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা জানিয়েছে যে আরাল সাগরটি নিওজিন যুগের শেষে (২৩ থেকে ২৬ মিলিয়ন বছর আগে) গঠিত হয়েছিল যখন দুটি নদী অর্থাৎ উত্তরে সির দরিয়া এবং দক্ষিণে আমু দরিয়া, তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে অভ্যন্তরীণ হ্রদ আরাল সাগরের উচ্চ জলস্তর বজায় রেখেছিল। এরপর চাষাবাদের জন্য এই দুটি নদী থেকেই পানি সেচ করতে গিয়ে শুকিয়ে যায় আরাল সাগর।নামে সাগর হলেও আরাল সাগর মূলত একটি হ্রদ। বিশালতার কারণে আরবদের কাছে এটি সাগর নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ সালের দিকে এটি পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। উত্তর থেকে সির দরিয়া ও দক্ষিণ থেকে আমু দরিয়া নদী থেকে পানি এসে মিশতো আরালের বুকে। লেকটি ধীরে ধীরে শুকাতে শুরু করে। ২০১৪ সালের নাসার প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায় হ্রদটির পূর্বাঞ্চলীয় বেসিনের পুরোটাই শুকিয়ে গেছে। অঞ্চলটি এখন আরালকুম মরুভূমি নামে পরিচিত।

সোভিয়েত ইউনিয়ন কারাকুম খাল খনন কি কোন চক্রান্ত ছিল প্রশ্ন অনেকের
১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কারাকুম খাল খনন করে। যার দৈর্ঘ ছিল ১৩৭৫ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত এটিই পৃথিবীর দীর্ঘতম সেচ খাল। এ খাল দিয়েই আমু ও সির দরিয়ার পানি কারাকুম মরুভূমির ভেতর দিয়ে তুলাক্ষেতে প্রবাহিত করা হতো। এই দীর্ঘ পথে ৩০ শতাংশ পানি অপচয় হতো। এ ছাড়াও আরও বিভিন্ন বাঁধ ও খাল খনন করা হয় সে সময়। যার মাধ্যমে নদির গতপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ বাড়তে থাকে, যার ফলে হ্রদের মাছ সব মরে যায়। সেই সঙ্গে কৃষি কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। আরাল সাগরের ধ্বংসের শুরুটা এখানেই।

মহাকাশ থেকে তোলা ২০০৩ সালের ছবি
আরাল সাগর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ২৭০ মাইল (৪৩৫ কিমি) এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১৮০ মাইল (২৯০ কিমি) এরও বেশি বিস্তৃত ছিল। কিন্তু খামার তৈরির জন্য নদীর পানি সরিয়ে নেয়ার পর সাগরের পানি কমে যায় এবং সমগ্র সাগর বাষ্পীভূত হয়ে যায়। যদিও এর হ্রদের কিছু অংশ বাঁচানোর প্রচেষ্টায়, কাজাখস্তান আরাল সাগরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে একটি বাঁধ তৈরি করেছে। কিন্তু এখন পানির উৎসকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
মানবদ্বারা বিলুপ্ত আরাল সাগরের বিশাল জলরাশি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত ছিলো। ৬৭ হাজার বর্গ কি.মি. আয়তনের হ্রদটি ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭০% শুকিয়ে যায় । মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলো আরাল সাগর। সাগরটি শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানকার ভূ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে আরাল সাগর তীরবর্তী এলাকার আবহাওয়া মোটেও বসবাসের জন্য উপযুক্ত ছিল না। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ১০০ মিলিমিটার, যা যেকোনো প্রাণীর বসবাসের জন্য প্রতিকূল। প্রতি লিটার পানিতে লবণের পরিমাণ ছিল গড়ে ১০ গ্রাম করে। হাতেগোনা কয়েক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ বেঁচে থাকতো সেখানে। এদেরকে ঘিরে আরালের বুকে গড়ে উঠে ক্ষুদ্র মৎস্যশিল্প। শুরু হয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় আড়াল সাগরের বিশাল ভূমিতে।