জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরান ও ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা করে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, একক কোনো পরাশক্তির আধিপত্য বিশ্বব্যাপী সবার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ ও পূর্বের দেশগুলো নিজেদেরকে ‘সার্বভৌম উন্নয়নকেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় আরও ন্যায়সংগত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উদ্ধৃত করে লাভরভ বলেন, ‘একক আধিপত্যের স্বৈরতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এর চারপাশের সবার জন্যই এটি বিপজ্জনক।’
চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার ঘটনায় নিন্দা জানান লাভরভ। তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ‘বিচারবহির্ভূত আটক’ রাখা হয়েছে দাবি করে তিনি অবিলম্বে তাদের মুক্তির আহ্বান জানান।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবারের সদস্য এবং দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদস্যদের হত্যার ঘটনাকেও ‘জবরদস্তিমূলক একনায়কত্বের আরেকটি অগ্রহণযোগ্য প্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
লাভরভ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিস্তৃত সামরিক অভিযানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতাধীন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা হয়েছে। এতে জাতিসংঘ-সমর্থিত পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধব্যবস্থার ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
গাজা প্রসঙ্গে লাভরভ বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা এখনও নিহত হচ্ছেন এবং সেখানে মানবিক পরিস্থিতি সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণের বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। লাভরভ বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর জন্য কোনো জমিই অবশিষ্ট থাকবে না।’
ফিলিস্তিনের পাশাপাশি লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, সুদান, সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ও প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।
লাভরভ ইউরোপীয় সরকারগুলোর বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলায় সহায়তার অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, এসব দেশ শান্তি আলোচনা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসনসহ অনেকেই শান্তি আলোচনায় আগ্রহী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর নুরেমবার্গ বিচার শেষ হওয়ার ৮০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে লাভরভ বলেন, সেই বিচারের শিক্ষা সবাই গ্রহণ করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলো ‘ইউক্রেনীয় নাৎসিবাদ’ সহ্য করছে এবং রুশ ভাষা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লাভরভ বলেন, ‘সত্য ও ন্যায়ের জন্য আমাদের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া হবে। বিশেষ সামরিক অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হবে, রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি দূর করা হবে এবং শান্তিপূর্ণ জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।’
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রসঙ্গে লাভরভ বলেন, জার্মানি বা জাপানকে নতুন সদস্য করা উচিত নয়। তার দাবি, দেশ দুটি ‘সামরিকীকরণ ও প্রতিশোধপরায়ণতার পথে’ এগিয়েছে। এর পরিবর্তে ব্রাজিল ও ভারতকে স্থায়ী সদস্য করার পাশাপাশি আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।
রাশিয়ার উদ্যোগে তৈরি জাতিসংঘের সাইবার অপরাধবিষয়ক কনভেনশনকে স্বাগত জানান লাভরভ। গত বছরের অক্টোবরে হ্যানয়ে স্বাক্ষরের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। কনভেনশন বাস্তবায়নে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রসঙ্গে তিনি বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে সংলাপ এবং চীনের নেতৃত্বে রাশিয়ার সমর্থিত একটি বৈশ্বিক এআই সহযোগিতা সংস্থা গঠনের প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।
লাভরভ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য সমান ও অবিভাজ্য নিরাপত্তার নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় ন্যাটোর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলেন তিনি।
তিনি জানান, রাশিয়া, বেলারুশ ও তাদের সমমনা অংশীদাররা নিউইয়র্কে এক বিবৃতি গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীতে বৈচিত্র্য ও বহুমেরুকেন্দ্রিকতার বিষয়ে একটি ইউরেশীয় সনদ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
অন্য দেশগুলোকে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লাভরভ বলেন, এর লক্ষ্য হবে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একটি নতুন মহাদেশব্যাপী কাঠামো গড়ে তোলা।