সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান পরিবহন সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটের হাইজ্যাক হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে বাস্তবে বিষয়টি ছিল উড়োজাহাজের ককপিটে দুই পাইলটের মারামারি। এবং সে কারণেই ফ্লাইটটি ইসরায়েলে না গিয়ে সৌদি আরবে অবতরণ করে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের ওই ফ্লাইটে মাঝ আকাশে পাইলটদের মধ্যে মারামারি হয়। এর পর জরুরি সংকেত পাঠিয়ে সৌদি আরবে অবতরণ করে ফ্লাইটটি। আজ বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৭ জন ছিল শিশু।
বিমানের দুই পাইলটের মধ্যে মারামারির পর বিমানটি জরুরি সংকেত পাঠায়। এতে প্রথমে ধারণা করা হয়, বিমানটি হয়তো ছিনতাই বা হাইজ্যাক করা হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ইসরায়েল বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমানও আকাশে পাঠায়। ফ্লাইদুবাই পরে নিশ্চিত করে যে, বিমানের দুই পাইলটের মধ্যে মারামারির কারণেই বিমানটি সৌদি আরবে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ইসরায়েলের দিকে যাওয়ার সময় বিমানটি কিছুক্ষণের জন্য এমন একটি ট্রান্সপন্ডার কোড পাঠায়, যা বিমানে ‘অবৈধ হস্তক্ষেপ বা হাইজ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা’ বোঝায়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বিমান ছিনতাই হিসেবে বিবেচনা করে। পরে তারা জানতে পারে, ককপিটে পাইলটদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই সম্ভবত ওই সংকেত পাঠানো হয়েছিল। বিমানটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সৌদি আকাশসীমায় প্রবেশের পর বিমানটি অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় উড়তে থাকে এবং নিরাপদে অবতরণ করে।
ককপিটে একজন সাধারণ যাত্রী বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেয়া কি সম্ভব ?
ঘটনার দুদিন আগে গত রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেতানিয়াহু অত্যন্ত গোপন একটি সফর করেছিলেন। এর দুই দিন পরই বিমানকাণ্ডটি ঘটে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) আমেরিকায় হামলার পর বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। বিমানের ককপিটের দরজা সম্পূর্ণ বুলেটপ্রুফ এবং এটি ভেতর থেকে শক্তভাবে লক করা থাকে। পাইলটদের অনুমতি ছাড়া কোনো যাত্রীর পক্ষে ককপিটে প্রবেশ করা অসম্ভব।
অটো-পাইলট (Autopilot) ও এটিসি (ATC) এর ভূমিকা কি একজন সাধারণ যাত্রী বুঝতে পারে ?
যদি কোনো চরম জরুরি অবস্থায় (যেমন: দুই পাইলটই যদি হঠাৎ অসুস্থ বা অজ্ঞান হয়ে যান) কোনো যাত্রী ককপিটে প্রবেশ করতে পারেন, তবে তার একমাত্র আশা হলো অটো-পাইলট এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC)।
যাত্রী যদি রেডিও অন করে মাটিতে থাকা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, তবে কন্ট্রোলার তাকে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিতে পারেন।
একটি বাণিজ্যিক বিমানের (যেমন: বোয়িং বা এয়ারবাস) ককপিটে অনেক সুইচ, বোতাম, লিভার এবং স্ক্রিন থাকে। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা সম্ভব নয় যে কোন বোতামটি কী কাজ করে। ভুল কোনো বোতাম চাপলে বিমানটি মুহূর্তের মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
অটো-ল্যান্ডিং: আধুনিক বিমানগুলোতে ‘অটো-ল্যান্ড’ (Autoland) প্রযুক্তি থাকে। রানওয়ে যদি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন হয় এবং বিমানের অটো-পাইলট সচল থাকে, তবে অভিজ্ঞ কন্ট্রোলারের কথামতো যাত্রী কেবল কয়েকটি সঠিক বোতাম চেপে বিমানটিকে নিজে নিজেই অবতরণ করার সুযোগ করে দিতে পারেন।

তখনও বিমানের ভেতরে আসলে কী ঘটেছিল, তা পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামিরও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। তিনি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর কমান্ডার, অপারেশনস ডিরেক্টরেটের প্রধান, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান এবং অন্যান্য কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২, চ্যানেল ১৫ ও টাইমস অব ইসরায়েলকে ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিমানে থাকা যাত্রীরা সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁরা জানান, উড্ডয়নরত অবস্থায় বিমানটির সামনের দিক থেকে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যায়। ককপিটের দরজা খুলে গেলে ভেতরে রক্ত দেখতে পান তাঁরা।
ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বিমানবন্দর থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে উড্ডয়ন করে। এর গন্তব্য ছিল তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিমানটির সেখানে সকাল প্রায় ৯টা ৩০ মিনিটে অবতরণের কথা ছিল। উড্ডয়নের প্রায় ৯০ মিনিট পর, বিমানটি যখন জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করছিল, তখন সেটি স্কোয়াক কোড ৭৭০০ পাঠায়। বিমান চলাচলে ৭৭০০ হলো আন্তর্জাতিক ট্রান্সপন্ডার কোড, যা সাধারণভাবে জরুরি পরিস্থিতি বোঝায়।
এরপর বিমানটি ৭৫০০ কোড পাঠায়। এই কোডের অর্থ হলো বিমানে অবৈধ হস্তক্ষেপ হয়েছে। বিমান ছিনতাই বা হাইজ্যাকিংয়ের সঙ্গে এই কোডটি যুক্ত। প্রায় একই সময়ে বিমানটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে। সেটি ঘুরে আবার **সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রবেশ করে** এবং সৌদি ভূখণ্ডের ওপর অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় উড়তে শুরু করে। প্রথমে বিমানটি দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল। পরে সেটি পশ্চিম দিকে মোড় নেয় এবং সৌদি আরবের আকাশসীমার মধ্যেই অবস্থান করতে থাকে। বিমানের ভেতরে কী ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করার সময় ইসরায়েলি বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান পাঠায়।
ঘটনার প্রথম দিকে এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিমানটি হাইজ্যাক করা হয়েছে এমন নিশ্চিত কোনো প্রমাণ তাদের কাছে ছিল না। তবে তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ বিমানের পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ওই কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘হাইজ্যাকিংয়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। পাইলট একটি জরুরি সংকেত চালু করেছেন। আমরা পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, আর সেটিই উদ্বেগের বিষয়।’
পরে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানতে পারে যে, ঘটনাটি সম্ভবত কোনো হাইজ্যাকিংয়ের চেষ্টা নয়। বরং বিমানের ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষের কারণেই জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং ওই সংকেত পাঠানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিমানটি যাত্রীদের নিয়েই সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করে।