• ৯ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ : প্রথম স্থান অধিকারীসহ বাদ ৫৭ জন

Usbnews.
প্রকাশিত অক্টোবর ১, ২০২৬
৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ :  প্রথম স্থান অধিকারীসহ বাদ ৫৭ জন
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশপ্রাপ্ত ৬৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬১১ জনকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রবেশ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রার্থীসহ সাময়িকভাবে মনোনীত ৫৭ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও গেজেটে তাদের বাদ পড়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে পিএসসি। শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন বিষয়ের ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে সে সময় ৬৬৮ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। বাকি ১৫টি পদে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় কাউকে সুপারিশ করা সম্ভব হয়নি বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ৫৭ জনকে বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৬১১ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হলো।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, পিএসসির সুপারিশক্রমে মনোনীত ৬১১ জন প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রবেশ পদে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা বেতনক্রমে নির্ধারিত শর্তে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

প্রথম স্থান অর্জনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল রানার নাম গেজেটে না থাকা

এদিকে মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এই বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল রানার নাম গেজেটে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

গেজেট থেকে বাদ পড়ার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে সোহেল রানা লেখেন, ‘ধন্যবাদ, বাংলাদেশ ৪৯ তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে ১ম হয়েও আমাকে গ্যাজেট থেকে বঞ্চিত করার জন্য।’

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার এবং ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন করার গিফট পেয়েছি

৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে মেধাক্রম ১৪ হয়েও গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজমুল হোসাইন প্রান্ত। গেজেট থেকে বাদ পড়ার কারণ জানেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নাজমুল হোসেন লিখেছেন, ‘আমি কেনো গেজেটেড হইলাম না সেই উত্তর আমার কাছে নাই। এটাও হইতে পারে যে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার এবং ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন করার গিফট পেয়েছি।’

৪৯তম বিসিএসে বাদ পড়ে অসুস্থ বাবা-মায়ের জন্য প্রার্থীর হাহাকার

৪৯তম বিসিএসে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ পেয়েও গেজেট না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. জসীম উদ্দীন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও বোনদের পড়াশোনার দায়িত্বের কথা তুলে ধরে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান তিনি।

জসীম উদ্দীন তার পোস্টে লেখেন, ‘৪৯ তম বিসিএস-এ ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছিলাম, কিন্তু এই রাষ্ট্রযন্ত্র আমাকে ১০ মাস ২০ দিনের ভেরিফিকেশান-রিভেরিফিকাশান শেষে গেজেট দেয় নি!’

তিনি লেখেন, ‘আমার বাবা-মায়ের চিকিৎসা খরচ, বোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব এই রাষ্ট্র কখনও নেবে না আমি জানি; কিন্তু একই সাথে আমাকেও গেজেট দেবে না?’

সুপারিশ পাওয়ার পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা জানিয়ে জসীম উদ্দীন লেখেন, ‘সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে আর আট-দশজন চাকরি প্রত্যাশীদের মতো আমিও খুশি হয়েছিলাম; পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসাবে স্বপ্ন বুনেছিলাম। কখনও কোনো হামলা-মামলা, অন্যায়, অবিচারে যুক্ত ছিলাম না কিন্তু শিকার হয়েছি। আমাকে যারা কাছ থেকে চিনেন, তারা জানেন আমি কেমন এবং আমার সার্বিক অবস্থা!’

নিজের মেধা ও যোগ্যতায় চাকরির সুপারিশ পেয়েছেন দাবি করে তিনি লেখেন, ‘সরকার বাহাদুর আপনাকে বলছি, কারো দয়ায় কিংবা সুপারিশে চাকরিটা পাইনি। নিজের মেধা এবং যোগ্যতায় পেয়েছিলাম, যেটা কেঁড়ে নিয়ে আমার প্রতি চরম অন্যায়, অবিচার করেছেন!’

বাবার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও লেখেন, ‘আপনি সরকার বাহাদুর হলেও আমার বৃদ্ধ-অসুস্থ বাবার সামনে দাঁড়ানোর সৎ সাহস আপনার নেই। কারণ আমাকে অন্যায়, অযৌক্তিকভাবে বাদ দিয়েছেন। চাকরিটা আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল, ভীষণ!’

প্রথম পোস্টের কিছুক্ষণ পর জসীম উদ্দীন আরও একটি পোস্ট দেন। সেখানে ৪৯তম বিসিএসের যোগদানের দিন আগামী ১২ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আত্মহুতির ঘোষণা দেন তিনি।

দ্বিতীয় পোস্টে জসীম উদ্দীন লেখেন, ‘সময়টা ২০১০ সালের ডিসেম্বর, তিউনিসিয়ার যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি (Mohamed Bouazizi) রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নে শেষ পর্যন্ত শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহুতি দিলেন। তার জীবনের বিনিময়ে পুরো আরব বিশ্বে বেশ পরিবর্তন এসেছিল। আজ থেকে সে আমার আইডল।’

‘ঘোষণা’ শিরোনামে তিনি আরও লেখেন, ‘৪৯ তম বিসিএস-এর জয়েনিং (১২ অক্টোবর) দিন সন্ধ্যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আমিও শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহুতি দেওয়ার ঘোষণা দিলাম।’

পোস্টের শেষাংশে তিনি লেখেন, ‘আমার জীবনের বিনিময়ে হয়তো কিছুই অর্জিত হবে না কিন্তু ভেরিফিকেশান নামক হয়রানি এবং গেজেটের দাসত্ব থেকে এই জাতির মেধাবী সন্তানরা মুক্ত হোক সেই কামনা রইল।’

জসীম উদ্দীনের এসব অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে বুধবার রাত পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি

 

‘স্ত্রী ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, সে এখন পাশে বসে কাঁদছে, মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছি না’

১০ মাসের অপেক্ষার পর আজ যে দিনটিকে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন ভেবেছিলাম, সেই দিনটিই যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন হয়ে এলো। যে স্বপ্নের জন্য গত এক বছর জীবনের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছি, শেষ মুহূর্তে সেই স্বপ্নই হাতছাড়া হয়ে গেল। আজ গেজেট প্রকাশের দিনে আমার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও আজ আমার নেই।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ৪৯ বিসিএস থেকে বাদ গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র রেদওয়ান আহমদ তাহমিদ এভাবেই লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র তিনি।

ফেসবুকে তাহমিদ লিখেছেন, আমি গত বছরের জুন থেকে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে চাকরির জন্য পড়াশোনা শুরু করি। আল্লাহ আমার জন্য ভালোও করতে থাকেন। প্রথমে ব্যাংকের প্রিলিমিনারি ও রিটেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। পরবর্তীতে ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হই।

কিন্তু পরবর্তীতে ৪৯তম বিসিএসের পরীক্ষা মাত্র ২০ দিন পর থাকায় রিটেনের প্রস্তুতি শুরু না করে এক বড় ভাইয়ের কথায় ৪৯তম বিসিএসের জন্য পড়াশোনা শুরু করি। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিটি বিসিএসেরই মূল্য আছে, তাই এখন ৪৯তম বিসিএস নিয়ে পড়ো।’ আলহামদুলিল্লাহ, পরীক্ষা দেওয়ার পর বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বলি, আমি রিটেন (MCQ) টিকে যাব। শেষ পর্যন্ত তাই হয়। এরপর ভাইবার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।

আমার বিভাগের একাধিক শিক্ষকের কাছে যাই এবং ভাইবায় ভালো করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিই। এই ভাইবাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরির ভাইবা। এক ভাই বলেছিলেন, ‘ভাইবায় ভালো করার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসার ঊর্ধ্বে কিছু নেই।’ ভাইবায় গিয়ে আমি কথাটি বারবার স্মরণ করি।

আমি সিরিয়ালে প্রথম ছিলাম এবং এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম ভাইবা। তারপরও কোনো ভয় পাচ্ছিলাম না। ভালো একটি ভাইবা দিই। কিছুদিন পর আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুপারিশপ্রাপ্ত হই। তারপর শুরু হয় আমার জীবনের কষ্টের অধ্যায়।

সরকার পরিবর্তনের কারণে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে। অন্যদিকে, অনেক চাকরিতে আবেদন করলেও এই বিসিএসে গেজেটেড হওয়ার আশায় ও ভরসায় অন্য কোথাও পরীক্ষা দিইনি। কমপক্ষে ১০-১৫টি চাকরিতে আগে থেকেই আবেদন করা ছিল, কিন্তু সেগুলোর পরীক্ষাও দিইনি। অন্যদিকে, পরবর্তীতে অনেক ভালো চাকরিতেও আবেদন করিনি।

আমার আশা ছিল, আল্লাহ আমার জন্য যে রিজিক লিখে রেখেছেন, তা থেকে আমি বঞ্চিত হব না। কিন্তু ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ১০ মাস বিলম্বিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত আমাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়।

আমি ঢাকায় ছোট একটি একরুমের বাসায় সহধর্মিণীকে নিয়ে থাকতাম। পরিবারের সবার আশা ছিল, আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারকে সাহায্য করব। নিজেরও অনেক আশা ছিল। অন্যদিকে, আমার সহধর্মিণী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাকে একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য সবসময় জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করি। ভেবেছিলাম, হয়তো এই চাকরির মাধ্যমে তাকে একটি সুন্দর জীবন দিতে পারব। কিন্তু আজ সে অঝোরে আমার পাশে বসে কাঁদছে।

তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমি তাকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে আমার কাছে থেকে একসঙ্গে গেজেটের দিনটি উদযাপন করতে চেয়েছিল। ভেবেছিলাম, আজ হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।

কিন্তু তা আর হলো না। আজ তার মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছি না।’

বাদ পড়ার সম্ভাব্য কারণ জানতে চাইলে তাহমিদ বলেন, আমার বাবা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা জামায়াতের আমির। সেজন্যই হয়তো আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভেরিফিকেশনের সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে, আমার পরিবারের কেউ রাজনীতি করে কিনা। আমি আব্বার কথা বলেছিলাম, যে তিনি জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া তো আমাকে বাদ দেওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।