মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ক্রিস্টা পাইককে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য টেনেসিতে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর বিল লি।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে লি বলেন, আইনসম্মতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা অঙ্গরাজ্যের “সবচেয়ে গুরুতর দায়িত্বগুলোর” একটি। তিনি আরও বলেন, “ঠিক কী ঘটেছে তা নির্ধারণের জন্য” তিনি একটি স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার টেনেসির কারা কর্মকর্তারা পাইককে পেন্টোবারবিটালের দুটি প্রাণঘাতী ডোজ প্রয়োগের চেষ্টা করেন। তবে তিনি বেঁচে যান এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি।
৫০ বছর বয়সী পাইককে ১৯৯৬ সালে কোলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পাইকের বয়স ছিল ১৮, যখন তিনি এবং তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ ১৯ বছর বয়সী স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন এবং হত্যা করেন।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তিনি টেনেসিতে ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রথম নারী হতেন।
আদালতে দাখিল করা নথিতে পাইকের আইনজীবীরা বলেছেন, ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টার পর তার জীবন রক্ষার জন্য জরুরি চিকিৎসা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল।
২০২৬ সালে এটি দ্বিতীয়বার, যখন টেনেসির কর্মকর্তারা কোনো বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
মে মাসে টনি ক্যারাদার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়, কারণ কর্মীরা প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত শিরা খুঁজে পাননি। পরে ক্যারাদার্সকে এক বছরের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
১৮ বছর বয়সে করা হত্যাকাণ্ডের দায়ে ৫০ বছর বয়সী পাইকের মৃত্যুদণ্ড

হত্যাকারী ক্রিস্টা গেইল পাইক।
পাইকের বয়স ছিল ১৮, যখন তিনি এবং তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ ১৯ বছর বয়সী স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন এবং হত্যা করেন।
১৯৯৫ সালে টেনেসির নক্সভিলে ওই হত্যাকাণ্ড গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার একটি বড় কারণ নিহত কলিনের বুকে সেসময় একটি উল্টো পেন্টাগ্রাম, যা শয়তানের উপাসনা করে এমন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত এক প্রতীক, খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।
যদিও পাইক নিজে সে প্রতীক খোদাই করার কথা বরাবর অস্বীকার করে এসেছেন। হত্যার আগে পাইক কলিনের বিরুদ্ধে তাকে অপমান করা এবং তার তৎকালীন প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেছিল।
চাকুরি বিষয়ক ক্যাম্পের আরও দুজন বাসিন্দা পরে সাক্ষ্য দেন যে, পাইক হত্যাকাণ্ডটির আগে ও পরে তা নিয়ে দম্ভ করেছিল, এবং তাদেরকে কলিনের মাথার খুলির একটি টুকরো দেখিয়েছিল।
১৯৭৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১৮ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পুরুষের সংখ্যা ১,৬৬৩ জন।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রাণঘাতী ইনজেকশন বন্ধ করার দুইটি পৃথক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল।
বুধবার গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্ট দিনের শুরুতে নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি স্থগিতাদেশ বাতিল করে দিয়েছে। নিম্ন আদালত পাইকের মামলার যুক্তিগুলো বিবেচনার জন্য আরও সময় প্রয়োজন বলে মামলাটি স্থগিত করেছিল।
এর আগে সুপ্রিম কোর্ট পাইকের আইনজীবীদের করা এক আপিল খারিজ করে দেয়। সেখানে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে জুরি তার শৈশবে যৌন নির্যাতনের নথিভুক্ত ইতিহাসের মতো প্রমাণগুলো বিবেচনা করার সুযোগ পায়নি।
তবে, প্রতিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন যে, টেনেসি অঙ্গরাজ্য বছরের পর বছর ধরে আদালতে এই যুক্তি দিয়ে আসছে যে, তিনি শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলেছিলেন।
কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, তিনি যে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, তা তারা অস্বীকার করেন না।
টেনেসির গভর্নর এ সপ্তাহে পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন, যিনি রাজ্যের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় থাকা একমাত্র নারী।
দুবার প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর ‘জীবিত’ টেনেসির সেই নারী, নেওয়া হলো হাসপাতালে
পাইকের আইনি দল টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, “আজ রাতে টেনেসি রাজ্য আবারও একটি আইনসম্মত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
“সঠিক প্রমাণিত হওয়া নিয়ে আমরা আনন্দিত নই, কিন্তু মিস পাইকের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। শিরা খুঁজে পেতে অসুবিধা, শিরা ফেটে যাওয়া, কার্যকারিতাহীন পেন্টোবার্বিটাল, এবং আকস্মিক ও অনিবার্য প্রয়োজনের সময় জরুরি চিকিৎসার অভাব – এই সবকিছুই এমন এক প্রোটোকলের অধীনে ঘটে যা কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা।”
প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগে দৃশ্যত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পাইকের আইনজীবীরা তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য একটি জরুরি আবেদন দাখিল করেছেন।
জেলা জজ ক্লিফটন এল কর্কার এক রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, “আবেদনে করা অনুরোধ অনুযায়ী চিকিৎসাকর্মীরা ইতোমধ্যে সেবা প্রদান শুরু করেছেন।”
টেনেসি সংশোধন বিভাগ জানিয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় তারা যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার সবগুলোই সঠিক ছিল বলে তারা মনে করে।
“টেনেসি সংশোধন বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত রাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যপ্রণালীর প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে,” বিভাগের মুখপাত্র ডোরিন্ডা কার্টার টেনেসির স্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেছেন।
“প্রোটোকলে থাকা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং আজ (স্থানীয় সময় বুধবার) সন্ধ্যায় যা করা হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতির অনুমতি প্রোটোকলে নেই। ক্রিস্টা পাইককে কারাগারের বাইরের এক চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে,” তিনি বলেন।
এদিকে, পাইকের আইনি দলের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক ডক্টর জোয়েল জিভোট বলেছেন যে, “মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টার সময় সম্ভবত তার রক্তে পেন্টোবার্বিটালের মাত্রাই এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যা শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধের কারণ হতে পারে।”