উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বঙ্গভঙ্গকে ঘিরে যে রাজনৈতিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা শুধু বাংলার ইতিহাসেই নয়, পরবর্তী ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনাপ্রবাহে স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। পূর্ববঙ্গ ও আসামের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়নের প্রশাসনিক দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। কেউ তাঁকে দক্ষ ও কর্মঠ প্রশাসক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, আবার কেউ তাঁকে ব্রিটিশ বিভাজন নীতির অন্যতম বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখেছেন। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, ফুলারের ভূমিকা কি শুধুই প্রশাসনিক দক্ষতার প্রকাশ ছিল, নাকি তাঁর কর্মকাণ্ড ভারতীয় রাজনীতিতে বিভাজনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনায় ভূমিকা রেখেছিল?
স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের জন্ম ১৮৫৪ সালে ইংল্যান্ডে। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর তিনি বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের আস্থা অর্জন করেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা। এর ফলে দীর্ঘ সময় পর ঢাকা আবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের প্রধান যুক্তি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি। সে সময় অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের আয়তন ছিল প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় আট কোটির কাছাকাছি। ব্রিটিশ প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এত বিশাল একটি অঞ্চল একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনের কারণে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল বলেও ব্রিটিশ সরকার দাবি করেছিল। এই যুক্তির ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে একত্র করে নতুন একটি প্রশাসনিক প্রদেশ গঠন করা হয়।
তবে প্রশাসনিক যুক্তির আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। উনিশ শতকের শেষদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব, সংবাদপত্র, সাহিত্যিক ও শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ বাংলায় সক্রিয় ছিল। লর্ড কার্জনের প্রশাসন এই ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ঐক্যকে ব্রিটিশ শাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছিল বলে বহু ঐতিহাসিকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ কারণে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিকে ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকদের একটি অংশ মনে করেন।
এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যামফিল্ড ফুলারের ভূমিকা ছিল সক্রিয়। নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি দপ্তর প্রতিষ্ঠা, বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ তাঁর প্রশাসনের অন্যতম কাজ ছিল। ঢাকা শহরে সরকারি ভবন নির্মাণ, শিক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষি উন্নয়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশেও তাঁর প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গের অনেক মুসলিম জমিদার, শিক্ষিত অভিজাত ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁদের দৃষ্টিতে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনের কারণে পূর্ববঙ্গ দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল এবং নতুন প্রদেশ তাদের জন্য উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজ বঙ্গভঙ্গকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। তাদের ধারণা ছিল, প্রশাসনিক দক্ষতার যুক্তি ছিল মূলত একটি অজুহাত। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শক্তি কমিয়ে দেওয়া এবং হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। এই ধারণা দ্রুত জনমনে ছড়িয়ে পড়ে এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
ব্যামফিল্ড ফুলারের প্রশাসনিক কার্যক্রম এই বিরোধকে আরও তীব্র করে। তিনি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে এমন বক্তব্য ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা সমালোচকদের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়েছিল। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গবিরোধী শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের প্রচেষ্টা তাঁর প্রশাসনকে জাতীয়তাবাদী মহলে সমালোচিত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে নেওয়া তাঁর কিছু পদক্ষেপও জাতীয়তাবাদীদের কাছে ব্রিটিশ দমননীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যামফিল্ড ফুলারের প্রশাসনিক জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ছিল তাঁর পদত্যাগ। ১৯০৬ সালে শিক্ষা প্রশাসনসংক্রান্ত একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে অপসারণের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত সরকার অনুমোদন না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন। ঘটনাটি তাঁর প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। তবে তাঁর পদত্যাগ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি।
বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। স্বদেশি আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়, বিপ্লবী সংগঠনগুলোর তৎপরতা বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তিও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন একটি ধারা তৈরি করে। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার পেছনে একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকলেও বঙ্গভঙ্গ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল বলে বহু গবেষক মত দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রবল গণআন্দোলন, রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতার মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেয়। একই সময়ে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নতুন গতি পায়, স্বদেশি আন্দোলন ভবিষ্যতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে প্রবণতা এ সময়ে দৃশ্যমান হয়, তা পরবর্তী কয়েক দশকে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এখনও একমুখী নয়। প্রশাসনিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি একজন কর্মঠ, সংগঠক ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাঁর প্রশাসন এমন একটি নীতির অংশ ছিল, যা ভারতীয় সমাজে বিভাজনের আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে আলাদা করে দেখেই তাঁর ভূমিকার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস দেখায়, প্রশাসনিক পুনর্গঠন সব সময় শুধু প্রশাসনিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থও গভীরভাবে যুক্ত থাকে। স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের কর্মকাণ্ডও সেই বৃহত্তর ঔপনিবেশিক বাস্তবতার মধ্যেই মূল্যায়ন করা উচিত।
একদিকে তিনি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসন এমন একটি নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করে এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বিভাজনের ভিত্তি দৃশ্যমান করে তোলে। তাই ইতিহাসের বিচারে স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারকে শুধু একজন প্রশাসক হিসেবে নয়, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিনিধি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।