• ১০ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৫শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর নাভি পিল্লাই বললেন, ‘এটি কি সত্যি?’

Usbnews.
প্রকাশিত অক্টোবর ৯, ২০২৬
শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর নাভি পিল্লাই বললেন, ‘এটি কি সত্যি?’
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। পুরস্কার ঘোষণার আগে নোবেল কমিটি তাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরতে পারেননি। পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার খবর জানতে পারেন তিনি। তবে প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি ৮৫ বছর বয়সী এই আইনজ্ঞ। খবর আরটিইর।

নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরতে না পারায় সহকর্মীদের কাছ থেকেই খবরটি পান পিল্লাই। এরপরও নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, খবরটি সত্যি কি না। একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করা তার দায়িত্ব—এমনটাই জানান তিনি।

এ সময় পাশে থাকা একজন তাকে বলেন, বিবিসিতেও তার নোবেল পাওয়ার খবর প্রচার করা হচ্ছে। তাই খবরটি সত্যি হওয়ারই কথা। এমন কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে পুরস্কার পাওয়ার খবর শোনার পর তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।

নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার সময় নাভি পিল্লাই নুরেমবার্গ আদালতে ছিলেন। তার প্রথম প্রতিক্রিয়ার মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।

ভিডিওতে পিল্লাইকে রসিকতা করতেও শোনা যায়। তিনি বলেন, উপস্থিত ব্যক্তিরা যদি তাকে আরও বেশি অভিনন্দন জানান, তাহলে তিনি তার পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।

নাভি পিল্লাই মজা করে ও ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘আপনারা যদি আমাকে আরও অভিবাদন জানান তাহলে আমি হয়ত ট্রাম্পের সঙ্গে পুরস্কারটি ভাগাভাগি করে নেব।’ তার এ মন্তব্যে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন।

তবে পুরস্কার পাওয়ার খবরের সত্যতা নিয়ে নিজের সংশয়ের কথা স্পষ্ট করেই জানান পিল্লাই। তিনি বলেন, ‘একজন আইনজীবী এবং বিচারক হিসেবে, আমি এখনো এটির সত্যতা যাচাই করতে চাই।’

নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। গত বছর প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে।

মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই

নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় গাজা নিয়ে তৈরি ওই প্রতিবেদন প্রসঙ্গেও কথা বলেন পিল্লাই। তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ আমি যা করেছি তা হলো গাজা নিয়ে তৈরি প্রতিবেদন দাখিল করা। যেখানে আমি উল্লেখ করেছি গাজায় গণহত্যা হচ্ছে। অনেক মানুষ ওই প্রতিবেদন পড়ার পর আমার সাহসের তারিফ করেছে। কিন্তু এ নিয়ে আমি অবাক হয়েছি। শুধুমাত্র সত্য বলতে কেন কাউকে সাহসী হতে হবে?’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করা নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

কে এই নাভি পিল্লাই

নাভানেথেম পিল্লাইয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নাটাল প্রদেশের ডারবানের ক্লেয়ারউড এলাকায়। তার বাবা ছিলেন একজন বাসচালক। আট ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতো।

পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে নাটাল অঞ্চলে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী হিসেবে পরিচিতি পান পিল্লাই। এ সময় বর্ণবাদী সরকারের হাতে আটক রাজনৈতিক কর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালান তিনি।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন পিল্লাই। ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮৮ সালে আইনবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার ডিগ্রি অর্জন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের পক্ষে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেন নাভি পিল্লাই। ১৯৯৯ সালে তিনি এই ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন।

রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনায় জঁ-পল আকায়েসুর বিচার চলাকালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৯৮ সালে দেওয়া ওই মামলার রায় আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির প্রতিষ্ঠা করে। এতে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। পরে ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নিযুক্ত হন তিনি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেন।

নারী অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় অবদান

মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নাভি পিল্লাই। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে নারী ও মেয়েশিশুর অধিকার রক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে কাজ করে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও অবদান রয়েছে তার। বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ বৈষম্যের শিকার না হন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছেন পিল্লাই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান দিক।

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘ পথচলা

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছেছেন নাভি পিল্লাই। রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে আইনি লড়াই, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে ভূমিকা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দায়িত্ব পালন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে কাজ। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় তার কর্মজীবন উল্লেখযোগ্য।