যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা ও লাঞ্ছনার অপচেষ্টার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ওই সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানান।
গত সোমবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অধ্যাপক ইউনূস হুইলচেয়ারে করে বের হওয়ার সময় কতিপয় ব্যক্তি তার পথরোধ করে উচ্চবাচ্যে অপবাদমূলক স্লোগান দেয় ও আপত্তিকর মন্তব্য করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, সেখানে উপস্থিত কিছু লোক আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চিৎকার করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রবাসী সমর্থকদের একাংশের বিরুদ্ধে এই হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টারা বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অপপ্রচার, অনলাইনে বিষোদ্গার এবং পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনায় তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিনের লাগামহীন আর্থিক লুটপাট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসসাধন, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং কাঠামোগত নিপীড়নে দেশ যখন পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল, তখন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব পালন করেছে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
একই সঙ্গে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের ইতি টেনেছিল এই সরকার।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা করার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্গঠন, বিগত কর্তৃত্ববাদী আমলের ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে যাবে বলেই সবার প্রত্যাশা ছিল। তবে গভীর অনুতাপের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, একটি স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক চক্র দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিপুল গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মিথ্যাচার ছড়াচ্ছে ও শারীরিকভাবে আঘাতের হুমকি দিচ্ছে।
কোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন বা অপপ্রচারে জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ও চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে মর্যাদা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে ঐতিহাসিক ভিত্তি রচিত হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি ও তাদের দোসররা তা কখনোই নস্যাৎ করতে পারবে না।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সাবেক উপদেষ্টারা হলেন—ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ড. সি আর আবরার, ড. আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, শারমিন এস মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান ঘটনাটিকে ‘আওয়ামী সন্ত্রাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা। পুনর্মিলনের জন্য গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার হতে হবে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত দলটির মধ্যে এখন পর্যন্ত অনুতাপের লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং তারা নানা ধরনের সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। ড. ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে, কারণ শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে তাদের আপত্তি।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের আচরণের চেষ্টা হয়েছে। অভিনেত্রী বাঁধনকেও হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রকাশ্যে সহিংসতা ও সন্ত্রাসে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করা দলের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না। পুনর্মিলনের ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকলে আওয়ামী লীগেরই নিজেদের অবস্থান থেকে তা জানানোর কথা ছিল।
তিনি বলেন, দুই বছর পর দলটির আচরণ দেখে পুনর্মিলনের কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। ক্ষমা চাওয়া বা অনুতাপ প্রকাশের বদলে তারা হুমকি দিচ্ছে এবং সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।