আসন্ন ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী উপজেলা) আসনে আসন্ন উপ-নির্বাচন বর্তমান বিএনপি’র দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচন যেন ‘মাগুরা মডেলে’ অনুষ্ঠিত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা।
আসন্ন ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী উপজেলা) আসনে আসন্ন উপ-নির্বাচন বর্তমান বিএনপি’র দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচন যেন ‘মাগুরা মডেলে’ অনুষ্ঠিত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা। এটি যেন সত্য সত্যই অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় সেই প্রত্যাশা করছেন তারা। যদিও এই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে উপ-নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে সিইসি বলেন, “আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে, এই উপ-নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আপনারা প্রশংসা করবেন ইনশাআল্লাহ। এ জন্য যা যা পদক্ষেপ নেয়া দরকার, আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নেবো।” ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচিত এমপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেয়ার কারণে এই আসন শুন্য হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর এই উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
মাগুরা মডেলের পরিচয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘মাগুরা মডেল’ বলতে মূলত ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত মাগুরা-২ আসনের (মাগুরা সদর, শালিখা, মহম্মদপুর) উপজেলা উপ-নির্বাচনকে বোঝায়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অধীনে অনুষ্ঠিত এই উপ-নির্বাচনে নজিরবিহীন ও ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এর ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় এটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত বা ‘মডেল’ হিসেবে পরিচিতি পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনীতির ইতিহাসে এটি আলোচিত একটি বিষয় হিসেবে পৃথকভাবে স্থান করে নেয়। সেই উপ-নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে মূলত দেশে কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হয়। মাগুরা-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আছাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য হয়। উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিকুজ্জামান বাচ্চু এবং ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কাজী সালিমুল হক কামাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটগ্রহণের দিন তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রসাশনকে ব্যবহার করে ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল এবং ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে তৎকালীন বিরোধী দলগুলো। এই উপ-নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো সিদ্ধান্ত নেয় যে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ফলে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবি তীব্র রূপ নেয়। টানা আন্দোলন ও রাজপথের কঠোর কর্মসূচির মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা (ত্রয়োদশ সংশোধনী) অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটের ফলাফল পরিবর্তনের নেতিবাচক উদাহরণকে বোঝাতে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘মাগুরা মডেল উপ-নির্বাচন’ শব্দটি একটি প্রতীক বা বাগধারা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
সেসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনকারী জামায়াতে ইসলামী নেতৃবৃন্দ বলেছিলেন, “মাগুরা-২ উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে সরকারি ও প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করা তাদের দাবিকৃত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।” এবিষয়ে রাজনীতি-বিশ্লেষক ও গবেষক তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান বলেন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন শাসক এইচ এম এরশাদের কাছে প্রায় সব বিরোধী দল একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে তার ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তুলেছিল। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর সে দাবি পূরণও হয়েছিল। এরপর প্রায় সব দলের সম্মতিতে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী সম্পন্ন হয়েছিল। সে সময় জামায়াতসহ ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ কেউ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানও দ্বাদশ সংশোধনীর অংশ করার দাবি তুলেছিল। কিন্তু সেই দাবি পূরণ করা হয়নি। তবে কার্যত মাগুরা-২ উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপটেই তৎকালীন সকল বিরোধী দল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সাথে যোগ দেয়।”
সরকারি দলের প্রার্থীর বিতর্কিত বক্তব্য
ঠাকুরগাঁওয়ের এই নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীর বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রতীক বরাদ্দের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন। এসময় তিনি বলেন, “অতীতে বিরোধী দলের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার নানা বঞ্চনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারদলীয় সংযোগ না থাকলে চাইলেও এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করা সম্ভব হয় না।” তিনি বলেন, “ঠাকুরগাঁও-১ আসনে যদি বিরোধী দলের কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তাহলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম কতোটা এগোবে, তা নিয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।” তিনি বলেন, “যেহেতু আমার দল এখন সরকারে এবং সরকারের সঙ্গে আমার সরাসরি সংযোগ রয়েছে, তাই এলাকার মানুষ উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখে, তা পূরণে আমার সরকারই কাজ করতে পারবে।” তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। বিএনপি প্রার্থীর এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “যেসব এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেখানকার কি কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না? সরকারের দোহাই দিয়ে ভোটারদের মনে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।” বিশ্লেষকরা বলছেন, মির্জা ফয়সাল আমিনের এধরণের বক্তব্য গণতন্ত্র-বিরোধী। সরকারি দলের এমপি হলে এলাকার উন্নয়ন হবে আর বিরোধী দলের এমপি হলে উন্নয়ন হবে না- এধরনের বক্তব্য গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করবে। তারা মাগুরা মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানান।