জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সনদ ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় রূপ নিয়েছে। সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের সব প্রস্তাব অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলছে। এ অবস্থায় রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধীরা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও গণভোটে জনগণের সম্মতির পর প্রত্যাশা ছিল, এবার সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। সনদ স্বাক্ষরের পরই যেন থমকে গেছে সংস্কারপ্রক্রিয়া।
জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সই করার এক বছর পূর্ণ হলো। তবে সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে যেসব সংস্কার আনা হয়েছিল, এই সময়ের মধ্যে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল বিষয়ে সংস্কার করা হয়েছিল। পরে তা বিলুপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনও আর গঠিত হয়নি। এসব সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) না থাকলেও বিএনপি সরকার গঠনের পর এগুলো টেকেনি।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় জানানো হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় রাশ টানা হবে। নির্বাহী, বিচার এবং আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে। এই লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের যেটুকু ক্ষমতা কমেছিল, তা বাতিল হয়ে গেছে।
যেসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি, হবে কিনা প্রশ্ন
জুলাই সনদে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের এমপিদের গোপন ব্যালটের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এতে সব দল একমত হয়েছিল। কিন্তু গত আগস্টে অনুষ্ঠিত নির্বাচন হয়েছে প্রকাশ্য ব্যালটে।
সনদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতিকে গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়োগ ক্ষমতা দিতে আপত্তি রয়েছে বিএনপির।
সনদে বলা হয়েছে, কেউ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। সংবিধান সংশোধনের আগে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না। বিএনপি এই সংস্কার বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে।
সনেদ বলা হয়েছে, ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন হবে। সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন লাগবে। বিপরীতে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, বিএনপির ৩১ দফা অনুযায়ী সংসদে আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
সনদে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। তবে আপিল বিভাগে বর্তমানে বিচারপতির সংখ্যা পাঁচজন। একসময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৭। এই প্রস্তাবে নোট ডিসেন্ট না থাকলেও কার্যকর করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগে কাউন্সিল গঠন করেছিল। এর মাধ্যমে ২০২৫ সালে বিচারপতি নিয়োগও হয়। সনদে প্রস্তাব ছিল, কাউন্সিলকে কমিশনে রূপান্তর করা হবে। তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত না করে এ-সংক্রান্ত আইন করার প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। তবে গত এপ্রিলে অধ্যাদেশ বাতিল করায় কাউন্সিল বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে। তবে বর্তমান সরকার আগের মতোই পিএসসি এবং দুদকে নিয়োগ দিয়েছে নির্বাহী ক্ষমতায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টিআইবি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপসের কারণে রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরেও সংবিধান সংশোধন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটও জনস্বার্থে রাষ্ট্র সংস্কারে সহায়ক ভূমিকা রাখার বদলে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যস্ত রয়েছে।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে সই করে রাজনৈতিক দলগুলো। তখন বলা হয়েছিল, এই সনদ হবে ভবিষ্যতের পথরেখা। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ৯ মাসের সংলাপে সনদ প্রণয়ন করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি-জামায়াতসহ অধিকাংশ দল এতে সই করলেও কয়েকটি দল সই করেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ওই সময় সই করেনি। চার মাস পর চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তারা সনদে সই করে।
বিএনপি সনদ সই করার সময় এটিকে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল আখ্যা দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা জানায়। তবে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগেই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তোলে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৮টি বাস্তবায়নের বাধ্যবাদকতাসহ অনুমোদিত হয়। কিন্তু আট মাসেও এগুলো এখনও কার্যকর হয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদে ভোটের অনুপাতে সংবিধান সংশোধন অনুমোদনের ক্ষমতাসহ সংসদের উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গঠন পদ্ধতি গণভোটে অনুমোদন পেলেও কার্যকর হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।
বিএনপি বলছে, যেসব প্রস্তাবে দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। তবে বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে যেভাবে অনুমোদিত সেভাবে সংবিধান সংস্কার করতে হবে, সংশোধন নয়। এ দাবিতে রাজপথে নামা জামায়াত-এনসিপির জোট সরকারের গঠিত সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়নি।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সমকালকে বলেছেন, সংলাপের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও দ্বিমত ছিল না। এর ভিত্তিতেই সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা এতে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জনগণের চুক্তিপত্র। জনগণ গণভোটে সনদ অনুমোদন করে, তারাও চুক্তিতে অংশ নিয়েছেন। সুতরাং এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ আইন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, পুলিশ কমিশনসহ যেসব সংস্কার অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার করেছিল, সেগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে করা হয়েছিল বলে জানান আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, সংলাপে একমত হয়েও পরে বাতিল করা হয়েছে; যা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়ার শামিল। ফলে জুলাই সনদ কতটা বাস্তবায়ন হবে, এ নিয়ে সংশয় রয়ে যায়।
কী হওয়ার কথা ছিল
রাজনৈতিক দলগুলো সনদ স্বাক্ষরের পর গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এতে বলা হয়েছিল, নির্বাচনের দিনে গণভোট হবে। গণভোটে জনগণের কাছে জানতে চাওয়া হবে তারা জুলাই আদেশ অনুমোদন করেন কিনা। অনুমোদন করলে, আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।
আদেশে বলা হয়েছিল, এই পরিষদে ভোটের অনুপাতে সংবিধান সংশোধন অনুমোদনের ক্ষমতাসহ ১০০ আসনের সংসদের উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গঠন-সংক্রান্ত আটটি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
আদেশ অনুযায়ী, ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে পরিষদে সংবিধান সংস্কার করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠন করার পর সংসদে গণভোট অধ্যাদেশ পাস করা হয়নি। জুলাই আদেশও উত্থাপন করা হয়নি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে সরকার। কমিটি জানিয়েছে, আগামী জানুয়ারিতে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। এরপর আসবে সংবিধান সংশোধন বিল। সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের পরিবর্তনের কারণে এই বিল সংশোধনে পাসের পর, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে আবার গণভোট হতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সংসদের ভেতর থেকেই সমঝোতার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জুলাই সনদের সবটাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আরও বলব। সমাজের সব স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হবে।’
তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বিএনপি জুলাই সনদ ধারণ করলে ও জনগণের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করত। সরকার না চাইলে বিরোধী দলের আর কী করার আছে? আন্দোলনে যাওয়াই তো বিরোধী দলের কাজ।’২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে ওই বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি ও অধ্যাপক আলী রীয়াজকে সহসভাপতি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
কমিশন প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়। এরপর মতামতের ভিত্তিতে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৯টি বৈঠক হয়। পরে মৌলিক সংস্কারের ১৯টি বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা হয়। ২৩ দিনের আলোচনায় ১৯টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও ৮টিতে সর্বসম্মতি আসে; বাকি বিষয়গুলোতে ভিন্নমত ছিল।
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ভিত্তিতে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ভিন্নমতসহ সনদে স্বাক্ষর করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল। দুই দিন পর ১৯ অক্টোবর গণফোরাম এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে ৫ দফা সংলাপ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যার ভিত্তিতে সরকারকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির প্রস্তাব করে কমিশন। ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করে সরকার। যার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে দ্বিকক্ষের সংসদ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ভিন্নমত থাকবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করা হবে।
এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হয়। কিন্তু সনদের অঙ্গীকার মতে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা (এমপি) সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। আদেশটিকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বলেও দাবি করে দলটি। অন্যদিকে সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিরোধী দলের এমপিরা। এর পর থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে বিরোধী দলগুলো।
চলতি সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হয়। কিন্তু বিরোধীরা ওই কমিটিতে যায়নি। এর মধ্যেই কমিটি রাজনৈতিক দল, জুলাই যোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে আগামী বছরের জানুয়ারির অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হয়ে যাবে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে বিরোধী দল অংশ না নিলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকবে বলে মনে করেন সালাহউদ্দিন আহমদও। তাই তিনি বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দিয়ে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিরোধী দল কমিটিতে না গিয়ে দাবি আদায়ে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। এই দাবি আদায়ে আন্দোলন পর্যায়ক্রমে জোরদার করার ঘোষণা দিয়ে তারা বলছে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই চেতনার আলোকে যাতে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হয়, এ জন্য সর্বোচ্চ যা করা প্রয়োজন, তা তারা করবে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংসদের আসনের অনুপাতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাবে বিএনপির কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করেছে। অন্যদিকে ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে মাত্র একটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি রাখা হয়েছে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে এখনো তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতিসহ বিভিন্ন পদ দেওয়ার বিষয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে এসব সুযোগ দেওয়া সম্ভব হতো।’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাতিল চিফ হুইপের বক্তব্য, বিচারকদের বদলি বা পদায়নে আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দেয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্মতিতে তা কার্যকর হয়। এ প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষই যুক্ত থাকায় আলাদা সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই।
আর স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এতে পুলিশ কমিশনের চিন্তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন।
অন্য দলগুলো যা বলছে
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালনের কথা বললেও আপত্তি না থাকা বিষয়েও বিএনপি এখন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে রূপান্তরের প্রত্যাশা ছিল, এক বছর পরও তা অর্জিত হয়নি।
তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরকেই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তাঁর মতে, কিছু বিষয়ে ঐকমত্য না হলেও সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। নির্বাহী বিভাগ, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে যৌক্তিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে গণভোটের পর সংসদ ১৮০ কার্যদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ করলেই তা সংগত ও যৌক্তিক হতো বলে মনে করেন সাইফুল হক।
বিএনপি সংস্কার নিয়ে প্রতারণা করছে বলে মনে করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের যে পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে, তা মেনে না নেওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়ার শামিল। তবে ১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমার মধ্যে বিএনপি নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে এবং অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে আশা করেন তিনি।
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এক বছর পরও তা পূরণ হয়নি; বরং সরকারের পদক্ষেপে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দুই বিশেষজ্ঞের মত
জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়া হতাশাজনক বলে মনে করেন বিলুপ্ত হওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের অঙ্গীকার ও তাগিদ দেখে কমিশন ও নাগরিকদের বিশ্বাস ছিল, তারা দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন চায়। সে অনুযায়ী, সবার মতের প্রতিফলন ঘটিয়ে দ্রুত আলোচনা শেষ করে নির্বাচনের পথে এগোনোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কিন্তু এখন সংস্কার বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখছেন না জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন শ্লথগতিতে এগোচ্ছে, এটুকু বলতে পারলেও আমি এক অর্থে আনন্দিত হতাম। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই দেখতে পাচ্ছি না। এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয়, জনগণের কাছে মতামত চাওয়া এবং জনগণের দেওয়া মতামতকেও উপেক্ষা করার শামিল।’
বিলুপ্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার পূরণ হয়নি। গণভোটে পাস হওয়া সত্ত্বেও নতুন সংসদের অধিকাংশ সদস্য দ্বিতীয় শপথ নেননি, ১৮০ কার্যদিবসে সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেই। সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন ও সংকুচিত বিলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামনে এগোনোর বদলে আমরা পেছনে হেঁটেছি, যা হতাশাজনক।’