• ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৭ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর স্মরণে

usbnews
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৪
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর  মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর স্মরণে
নিউজটি শেয়ার করুনঃ
আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্বাঞ্জলি ও মাগফেরাত কাম্য।
মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, যিনি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী নামে অধিক পরিচিত।ওসমানী ১৯৪০ সালের অক্টোবরে ভারতে ব্রিটিশ রয়েল আর্মিতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪১ সালে ক্যাপ্টেন ও ১৯৪২ সালে মেজর পদে উন্নীত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা রণাঙ্গণে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন।
ওসমানীর পৈতৃক বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ থানার দয়াপীরে, বর্তমানে এটি ওসমানীনগর থানা। তার পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ছিলেন তৎকালীন সুনামগঞ্জ সদর মহকুমার সাব ডিভিশনাল অফিসার। সে সুবাদে ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে ওসমানীর জন্ম। পিতার বদলির চাকরির কারণে বিভিন্ন শহরে কেটেছে ওসমানীর শিক্ষাজীবন। ১৯৩৮ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯৩৯ সালে ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। একই সময়ে তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় সামরিক বাহিনীতে জেন্টেলম্যান ক্যাডেট নির্বাচিত হন। সিভিল সার্ভিসে না গিয়ে তিনি ওই বছরই সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার লক্ষ্যে দেরাদুনে ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক একাডেমিতে কোর্স সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশ জনগণের সাথে বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ১৯৭১ সালে মুক্তির লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। একাত্তরের ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির পদে নিয়োগ দেয়মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক।
যতদূর জানা যায়, ১৩ ডিসেম্বর বিকাল থেকে ১৬ ডিসেম্বর দুপুর পর্যন্ত ওসমানীসহ তাঁর সফর সঙ্গীরা ঢাকা থেকে মাত্র ৯৭ কিলোমিটার দূরত্বে কুমিল্লাতেই ছিলেন। এখানে থাকতেই ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত’র কাছে ওসমানী এবং তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রথম জানতে পারেন যে, ঢাকার পতন আসন্ন। সে অনুযায়ী তাঁরা ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্য মতে, ১৬ ডিসেম্বর সকালে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত’র কাছে জানতে পারেন যে, ওইদিন বিকালে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করবে।
এরপরের ঘটনা সম্পর্কে জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘‘জেনারেল ওসমানীর এডিসি আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল আমাকে বলল, ‘স্যার কখন রওনা হবেন, তা তো বলছেন না। জাফর ভাই, আপনি যান, জিজ্ঞেস করে সময় জেনে নিন।’… আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করায় ওসমানী সাহেব বললেন, ‘I have not yet received PM’s order to move to Dacca.’ আমি বললাম, আপনাকে অর্ডার দেবে কে? আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। ওসমানী সাহেব বললেন, I decide tactics, my order is final for firing, but I receive orders from the cabinet through PM, Mr. Tajuddin Ahmed.’ কথাগুলো বললেন অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। … ঘণ্টাখানেক পর পুনরায় ওসমানী সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর পরপরই অত্যন্ত বেদনার্ত কণ্ঠে যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, ‘আমার ঢাকার পথে অগ্রসর হবার নির্দেশ নেই। আমাকে বলা হয়েছে, পরে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একযোগে ঢাকা যেতে, দিনক্ষণ তাজউদ্দিন আহমেদ জানাবেন।’ গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন, এটাই স্বাভাবিক বিধান। এরপর ওসমানী সাহেব কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরি হতে বললেন। আধাঘণ্টার মধ্যে আমাদের আকাশে নিরুপদ্রব যাত্রা। ভারতীয় হেলিকপ্টারে সিলেটের পথে চলেছি।’’ এই সাত দফা চুক্তির কারণেই সম্ভবত জেনারেল ওসমানী সেদিন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘দেশ বিক্রি’র অভিযোগ করেছিলেন এবং ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বর্ণনায় তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, (জাফরুল্লাহ চৌধুরী- মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি খণ্ড চিত্র, নতুন দিগন্ত, ষোড়শ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা এপ্রিল-জুন ২০১৮, পৃ. ৫৭ থেকে ৫৯)
ওসমানীর সেদিনের সফরসঙ্গী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বর্ণনা থেকে বিষয়টির আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন- ‘‘ভারতীয় এম-৮ হেলিকপ্টারে সিলেটের পথে চলেছি। …অতর্কিতে একটি প্লেন এসে চক্কর দিয়ে গেল। হঠাৎ গোলা বিস্ফোরণের আওয়াজ, ভেতরে জেনারেল রবের আর্তনাদ। পাইলট চিৎকার করে বলল, ‘উই হ্যাভ বিন অ্যাটাকড। …অয়েল ট্যাংক হিট হয়েছে। তেল বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি বড়জোর ১০ মিনিট উড়তে পারবো।’ …ওসমানী লাফ দিয়ে উঠে অয়েল ট্যাংকারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘জাফরুল্লাহ, গিভ মি ইউর জ্যাকেট’। আমি আমার জ্যাকেট ছুড়ে দিলে, ওসমানী সাহেব সেটা দিয়ে তৈলাধারের ছিদ্র বন্ধের চেষ্টা করতে থাকলেন। …কার গোলাতে এই দুর্ঘটনা? পাকিস্তানের সব বিমান তো কয়েকদিন আগেই ধ্বংস হয়েছে, কিংবা গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। তাহলে আক্রমণকারী বিমানটি কাদের? গোলা ছুড়ে সেটি কোথায় চলে গেল? …ওসমানী নিচে একটা জায়গার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘ল্যান্ড হেয়ার’।…লাফ দিয়ে তিনি নামলেন। …সঙ্গে নামলাম নিজেও। আমার পেছনে পেছনে অন্যরা লাফিয়ে নামলেন। হেলিকপ্টারটা আমাদের চোখের সামনে দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে।’’
প্রসঙ্গত, ওই হেলিকপ্টারটিতে যাত্রী ছিলেন মোট আটজন- জেনারেল ওসমানী, তাঁর এডিসি শেখ কামাল, মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল এমএ রব, সাংবাদিক আল্লামা, ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ভারতীয় দুই পাইলট। অজ্ঞাত বিমানের গোলার আঘাতে বিপর্যস্ত হেলিকপ্টারটি মাটিতে নামার পর আগুনে পুড়ে গেলেও এর যাত্রীরা সবাই প্রাণে বেঁচে যান।
যুদ্ধের একটা পর্যায়ে ওসমানীকে ঘিরে কড়া নজরদারি করা হতো, সব ধরনের দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল, তাঁকে যুদ্ধের ময়দানেও যেতে দেয়া হতো না। ওসমানীর জন্য এই পরিস্থিতি ছিল বিব্রতকর এবং অপমানজনক। তারপরও ভারতের এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের জোরালো প্রতিবাদ করতেন তিনি, তেমন দৃষ্টান্তও আছে। মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী লক্ষ্ণৌতে গিয়েছিলেন চিকিৎসাধীন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফকে দেখতে। কলকাতায় ফেরার পথে বিমানে আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরছিলেন। আবদুস সামাদ আজাদ তাদের দু’জনের দেখা হওয়ার বিষয়টি জাফরুল্লাহকে গোপন রাখতে বলেন। এতে জাফরুল্লাহ’র সন্দেহ হয়। তিনি সামাদ আজাদের কাছে জানতে চান- ‘দিল্লিতে কী করলেন? কোনো চুক্তি হয়েছে কি?’ এরপর বিমানে বসে তাদের দু’জনের মধ্যে যে আলোচনা হয় সামাদ আজাদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে কলকাতায় ফিরে এসে ওসমানীকে সব বলে দেন জাফরুল্লাহ। শুনে ক্ষুব্ধ হন ওসমানী।
এরপর যা ঘটেছিল, জাফরুল্লাহ’র ভাষায়- ‘‘ওসমানী সাহেব সোজা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের ঘরে ঢুকে উচ্চস্বরে কথা বললেন, ‘You sold the country. I will not be a party to it.’ তাজউদ্দিন সাহেব ওসমানীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, নিচু স্বরে কী বললেন আমি শুনতে পেলাম না। আমি দরজার বাইরে ছিলাম।’’
কলকাতায় ফিরে জেনারেল ওসমানীকে কী বলেছিলেন জাফরুল্লাহ, তা তিনি পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা দেননি। তবে ধারণা করা হয়, তাজউদ্দিনের ওপরে ওসমানীর সেদিনের ক্ষোভের কারণ ছিল দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত সাত দফা চুক্তি, যা ছিল গোপনীয়। যুদ্ধ চলাকালে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ২/৪ জন অবগত থাকলেও ভারতে আশ্রিত বেশির ভাগ বাংলাদেশির কাছে এই চুক্তির বিষয়টি ছিল অজানা। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার প্রশাসনিক, সামরিক, বাণিজ্যিক, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে একটি সাত দফা গোপন সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন করে (তথ্যসূত্র: জাতীয় রাজনীতি: ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫- অলি আহাদ)
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার্থে লন্ডন থাকাকালীন ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে সমাহিত করা হয়।
(তথ্য বিভিন্ন সূত্র ও বই সংগৃহীত)