ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে গতকাল শনিবার সংঘটিত এই ব্যাপক ও বিক্ষিপ্ত আন্দোলন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর ওপর প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এর মধ্যে ফ্রান্সের আন্দোলন রূপ নেয় গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উত্তাল পরিস্থিতিতে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিক্ষোভে ৫৫ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেন এবং সারা দেশে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের পর এই মিছিলগুলো দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সহিংস ছোট ছোট গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল বুটিক ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়, ব্যাপক লুটপাট করে এবং পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী গ্যাব্রিয়েল আতাল প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত।
এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেছেন, ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের পরও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সহিংসতা দমনে ৬০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। রোববার তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেন। নুনেজ বলেন, ঘটে যাওয়া সবকিছুর দায় নিজের কাঁধে নিয়েই তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।
গত কাল শনিবারের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর দুই হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম সদস্য আহত হন। হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুও হয়।
রাজধানী প্যারিস, লিওঁ ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দোকানপাটে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি নগর ভবনে আগুন লেগে ছাদ ধসে পড়ে। প্যারিসে অন্তত পাঁচটি দোকান লুটপাটের শিকার হয়। লুটেরাদের হামলায় শহরের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রবেশপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানান, চলমান সংঘাতে ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে মোতায়েন করা পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি আরও কম হওয়াটা একটি অলৌকিক ব্যাপার।’
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, নিস, নান্তেস, বর্দো, লিমোগেস, লিলি, তুলুউজ এবং স্ট্রাসবুর্গে অসংখ্য দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোইরে বলেন, রাজধানীর পুরো রাস্তাগুলো ‘বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে। লিমোগেস শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো টাউন হল প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি মার্সেই এবং লিলির টাউন হল ভাঙচুর ও লুট করা হয়। এছাড়া লিওঁতে বিক্ষোভকারীরা শহরের প্রধান পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘোষণা দিয়েছেন, এর সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না; তাদের কঠোরভাবে ‘বিচার করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।’
বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও অসন্তোষ
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল—বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ ও আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ব্রাসেলসের পূর্বে অবস্থিত তুলনামূলক ছোট শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ দমাতে জলকামান মোতায়েন করা হয়। তবে বিক্ষোভে ঠিক কত মানুষ অংশ নিয়েছিল, তা পুলিশ জানায়নি।
এদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে তীব্র আবাসন সংকটের বিরুদ্ধে আনুমানিক দশ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেন। ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়ে গেছে, আর নতুন ভাড়ার চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় সমপরিমাণ খরচ বেড়েছে।
পর্তুগালের পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম গত শুক্রবার সাফ জানিয়ে দেন, ‘সরকার রাস্তার চিৎকারের কাছে মাথা নত করবে না।’ অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ “বিচ্ছিন্ন”।
ইতালিতেও সহিংসতা
ইতালির মিলানের কেন্দ্রস্থলে দাঙ্গাকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, দোকানপাট লুট করে এবং সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি করে। এর ফলে পিয়াজ্জা দেল দুওমো এবং সাধারণত ক্রেতাদের ভিড়ে মুখরিত থাকা একটি বিলাসবহুল আর্কেড সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়।
যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল দিয়ে প্রতিবাদ শুরু হলেও পরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর, ইটের টুকরোসহ বিভিন্ন বস্তু ছুঁড়ে মারে এবং রাস্তার বার টেবিল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
ইতালীয় বার্তা সংস্থা লাপ্রেস জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক্সে লিখেছেন, ‘বিক্ষোভ করা অধিকার। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে আগুন জ্বালানো অধিকার নয়।’ তিনি সে সমস্ত ‘বদমাশদের’ কাঠগড়ায় দাঁড় করান যারা ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভের সুযোগ নেয়।’ মিলানের কেন্দ্র-বামপন্থী মেয়র গিউসেপ্পে সালা বলেন, ‘বিক্ষোভের কারণগুলো যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ওপর সহিংসতা এবং শহরের মারাত্মক ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এ ছাড়া বোলোনিয়া শহরেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আড়ালে বিক্ষোভকারীরা ইট-পাথর ছুঁড়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইইউ আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে জানান, অন্যান্য দেশের বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো বিশাল আকার ধারণ না করলেও এটি সারা ইউরোপে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার একটি বড় লক্ষণ। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু…এবং এখন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে এটি ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।’
তাঁর মতে, এই শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নয়; বরং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন জায়গায় এমন আন্দোলন মাথাচাড়া দিতে পারে। তিনি জানান, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় ইতিমধ্যে এই আন্দোলনের ‘প্রাথমিক পর্যায়’ তৈরি হচ্ছে এবং ‘আগামী সপ্তাহে’ আরও বড় ধরনের জনসমাগম হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো কোনো একক আন্দোলন নয়, বরং বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ একই সময়ে ঘটছে যার মূল কারণগুলো অপর্যাপ্ত অর্থায়নের শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের স্নাতকোত্তর জীবনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
ইউরোপ যখন আগামী ১২ মাসের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে নির্ধারিত নির্বাচনসহ একটি ‘অভিনব সুপার-সাইকেল’ বা বিশাল নির্বাচনী চক্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই এই গণ-অস্থিরতা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। আলেমান্নো সতর্ক করে বলেন, ‘অবশ্যই এই সমস্ত বিক্ষোভ এবং আন্দোলন ইউরোপের আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে চলেছে।’