কাকডাকা ভোরের কুয়াশায় রাজধানী দিল্লির পথে হাজার হাজার যানবাহনের সারি। দীর্ঘ লাইনে পেছনে ফেরার পথ নেই। ‘দিল্লি চলো’ স্লোগানে জড়ো হয়েছেন ভারতের ৩ রাজ্যের কৃষকরা।
নিজেদের একাধিক দাবি আদায়ে পতাকা নেড়ে, হর্ন বাজিয়ে আওয়াজ তুলছেন তারা। মোদি সরকারের কাছ থেকে অধিকার নিশ্চিত করতে একেবারে আটঘাট বেঁধেই ঘর ছেড়েছেন কৃষকরা।
৬ মাসের খাবার নিয়ে ছুটছেন দিল্লির পথে। বিক্ষোভ জমাতে তাঁবুঘেরা ট্রাক্টরেই বানিয়েছেন ঘরবাড়ি। তবে ক্ষোভ ও মনোকষ্ট নিয়ে রাজধানীর পথে রওয়ানা হওয়া কৃষকদের দিতে ঢুকতে দিচ্ছে না পুলিশ।
দিল্লি সীমান্তে ফটকগুলো রীতিমতো দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে পুলিশ। প্রথম দিনের পর বুধবার আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনেও কাঁদানে গ্যাসসহ একাধিক হামলার শিকার হয়েছেন কৃষক। খবর এনডিটিভি, এএফপির।
কৃষক আন্দোলন বেশ চাপে ফেলেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে। বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকরা দিল্লি চলোর ডাক দিয়ে ট্রাক্টর নিয়ে এগোচ্ছেন। এই আন্দোলনের প্রভাবকে এখনই খাটো না করতে পারলে আসন্ন লোকসভায় এর ফল ভুগতে পারে বিজেপি। সেই আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এর নির্দেশে পঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই অবস্থা। আন্দোলন দমনের নামে সেখানকার সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ।
ঘুড়ি দিয়ে ড্রোনকে ‘ভোকাট্টা’ করে দিতে চাইছেন তাঁরা। আর কাঁদের গ্যাসের পালটা প্রতিরক্ষা হিসেবে পানির বোতল, ভিজে কাপড়, চোখ ঢাকা চশমা নিয়ে এসেছেন তাঁরা। পুলিশি প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে তাঁরা নারাজ।পান্ধেরের দাবি, যে আধাসামরিক বাহিনী কৃষকদের বিরুদ্ধে স্মোক সেল এয়ার বার্স্ট এবং স্মোক সেল গ্রাউন্ড বিস্ফোরণ ব্যবহার করেছে। মোবাইল পরিষেবার স্থগিত করার কথা উল্লেখ করে কৃষক নেতা বলেন, কেন্দ্র কি আমাদের অবস্থা মণিপুরের মতো করতে চাইছে?
কৃষকদের আন্দোলন এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের আন্দোলনেও সরকারের সহযোগিতা পায়নি তারা। পূর্ব অভিজ্ঞতার জেরে সুচ থেকে হাতুড়ি সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই বের হয়েছেন কৃষকরা। কিশান মজদুর মোর্চা এবং সম্মলিত কৃষাণ মজদুর মোর্চা (অ-রাজনৈতিক), ১৫০টি ইউনিয়নের একটি ব্যানারে ২৫০টি কৃষক ইউনিয়ন নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে এ আন্দোলন।
অধিকাংশ কৃষকই ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশের। সব মিলিয়ে প্রায় ৫,০০০ কৃষক অংশ নিয়েছেন এ প্রতিবাদে। তাই পুলিশরাও এবার বেশ সতর্ক! কড়াকড়ি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছে দিলি অভিমুখী প্রতিটি রাস্তা।
পঞ্জাবের সাতরানা, সামানা, ঘানৌর, দেবিগড়, বালভেরা থানার অন্তর্গত এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওদিকে হরিয়ানা সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা ও বাল্ক এসএমএস এর সুবিধা বন্ধ করিয়ে দিয়েছে। আমবালা, কুরুক্ষেত্র, কৈথাল, জিন্দ, হিসার, ফতেহাবাদ, সিরসা জেলায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে।
বিশাল বিশাল ভারী কংক্রিটের ব্যারিকেডের সামনে রাখা হয়েছে কাঁটাতারের শক্ত বেড়া। পুলিশদের ছোড়া অবিরাম গুলি থেকে বাঁচতে মাটিতে বসে আছেন কৃষকরা। এর মধ্যেই নতুন করে কৃষক নেতাদের আলোচনায় প্রস্তাব দিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর। তার দাবি, কাতারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপত ভারতের সাবেক নৌসেনা কর্মীদের যদি দেশে ফেরানো যায়, তবে আলোচনার মাধ্যমে সব কিছুই সম্ভব।
মঙ্গলবার একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে অনুরাগ জানান, কৃষক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যেহেতু নতুন চাহিদার কথা জানাচ্ছেন তারা। প্রতিবাদীদের প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পরামর্শ, প্রতিবাদ যেন হিংসাত্মক না হয়। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া বন্ধ না হলে, কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা করবেন না তারা।
ভারতীয় কিশান ইউনিয়নের নেতা জগজিৎ সিংহ দালেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার অভিযোগ, পুলিশ কৃষকদের দিকে লাগাতার কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে চলেছে। তা বন্ধ না হলে কৃষকরা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন না বলেই স্পষ্ট করেছেন জগজিৎ। তবে পুলিশের এমন আচরণে বেশ ক্ষেপেছেন অন্যান্য কৃষকরা।
পাঞ্জাবের লুধিয়ানার ৬৫ বছর বয়সি কৃষক সন্তোখ সিং বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের নেতাদের কাছ থেকে সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছি। তারা একবার বললে আমরা এসব বাঁধা ভেঙে দেব।
আরও এক কৃষক মোহন সিং বলেন, ‘পুলিশ আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন আমরা তার শত্রুদেশ থেকে এসেছি। আমরা শুধু দিল্লি গিয়ে আমাদের অধিকারের কথা বলতে চাই, কিন্তু ইতোমধ্যেই আমাদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।’ ভিড়ের মধ্যে আরও একজন চিৎকার করে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে জয়ী হয়ে দিল্লি যাব।’
সেসময়ে আন্দোলনের নেতারা মাইক দিয়ে সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানান। অন্যদিকে পুলিশও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েই যাচ্ছে। কৃষকরা কোনো আইন ভঙ্গ করলে তাদের আটকাতে মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ঘোষণা দিয়েছেন, ‘কৃষকরা সীমানা পার করে আসার চেষ্টা করলে আমরা তাদের মোকাবিলা করব। দিল্লির পরিস্থিতি যাতে ঠিক থাকে, তাই তাদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, কৃষকদের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য (এমএসপি) নিশ্চিতকরণ, ঋণ মওকুফ, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে সব মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ও অন্যান্য চুক্তি বাতিল, বিদ্যুৎ বোর্ডের বেসরকারীকরণ স্থগিত, কৃষিতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, করপোরেটাইজেশন নিষিদ্ধ করা এবং কৃষকদের জন্য পেনশন চালু করা।
কৃষকদের প্রতিবাদের সম্পর্কে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, দিল্লির দূরবর্তী একটি সীমানা কৃষকদের জন্য সম্ভাব্য প্রবেশ পয়েন্ট হিসাবে কাজ করতে পারে।
হরিয়ানা এবং পঞ্জাবের প্রতিবাদী কৃষকরা মঙ্গলবার দিল্লির দিকে তাদের পদযাত্রা শুরু করেছে। ২০০ টিরও বেশি কৃষক ইউনিয়ন ‘দিল্লি চলো’ পদযাত্রার জন্য জাতীয় রাজধানীতে যাত্রা করেছে। তাঁদের লক্ষ্য কেন্দ্রকে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা, যার মধ্যে ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের (এমএসপি) গ্যারান্টি রয়েছে।
‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে দিন, না হলে সমস্যার সমাধান করুন’, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিশানা করে তীব্র কটাক্ষ কৃষক নেতা সারওয়ান সিং পান্ধেরের । এদিন পান্ধের বলেন, সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী সফররত তিনজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসুক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী অর্জুন মুন্ডা, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাইয়ের সঙ্গে বিকেল ৫টা সময় বৈঠকে বসার কথা কৃষক নেতাদের। এই প্রসঙ্গে কৃষক নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের বলেন, আজকের বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত।
শম্ভু সীমান্তে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মজদুর সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক পান্ধের । বলেন, কেন্দ্রের প্রতিবাদী কৃষকদের দাবি মেনে নেওয়া উচিত। আমরা চাই কৃষকদের এই সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসুক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এদিন পান্ধের পঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে পুলিশের আচরণের নিন্দা করে বলেন, শক্তি ব্যবহার করে কৃষকদের আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এতে অনেকে আহত হয়েছেন। তিনি কাঁদানে গ্যাসের কয়েকটি শেলও দেখান।
বুধবারও কৃষকদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, রবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ। কৃষকরা যাতে ব্যারিকেডের কাছে পৌঁছাতে না পারে সেজন্য এই কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট, স্মোক বোম নিক্ষেপ করে হরিয়ানা পুলিশ। এদিকে, হরিয়ানা পুলিশের ড্রোনের জবাব দিতে ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করেছেন কৃষকরা। ঘুড়ি দিয়ে ড্রোনকে ‘ভোকাট্টা’ করে দিতে চাইছেন তাঁরা। আর কাঁদের গ্যাসের পালটা প্রতিরক্ষা হিসেবে পানির বোতল, ভিজে কাপড়, চোখ ঢাকা চশমা নিয়ে এসেছেন তাঁরা। পুলিশি প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে তাঁরা নারাজ।
এর আগে গত ১৩ তারিখ ভারতের রাজধানীতে ফের কৃষক আন্দোলনের ঢেউ। আজ দিল্লি চলোর ডাক একাধিক কৃষক সংগঠনের। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি, কৃষিঋণ মকুব, কৃষক-শ্রমিকদের পেনশন-সহ বিভিন্ন দাবিতে ফের আন্দোলনের ডাক কৃষক সংগঠনগুলির। কৃষক বিক্ষোভে অশান্তির আশঙ্কায় একাধিক জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে দিল্লি পুলিস। দিল্লি সীমানায় রয়েছে কড়া পাহাড়া।মঙ্গলবার সকালে কৃষকেরা ‘দিল্লি চলো’ অভিযানের ডাক দেয়। কৃষকদের রুখতে পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে দেয়। কার্যত দুর্গের চেহারা নেয় দিল্লি। বার বার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় রাজধানী।মঙ্গলবার কৃষক মিছিল রাজধানীতে প্রবেশ করার আগেই আটকে দেয় দিল্লি পুলিশ। পঞ্জাব-হরিয়ানা শম্ভু সীমান্তে আন্দোলনকারী কৃষকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়েন পুলিশ। ধোয়ায় ভরে যায় গোটা এলাকা। ব্যাপক বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুপক্ষের মানুষ আহত হয়। পঞ্জাব-হরিয়ানা এবং দিল্লি-উত্তর প্রদেশ সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় বিশাল ব্যারিকেড তৈরি করে দিল্লি পুলিশ। রাস্তায় লোহার পেরেক বসানো থেকে কাঁটাতারের বেড়াও দেওয়া হয়।